মঙ্গলবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০১৭ খ্রীষ্টাব্দ | ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ পাওয়ার পথ খুলল

ছয় বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ নিহতের ঘটনায় তার পরিবারকে চার কোটি ৬১ লাখ ৭৫ হাজার ৪৫২ টাকা ক্ষতিপূরণের রায় দিয়েছে হাইকোর্ট। উচ্চ আদালতের এ রায় নজির হয়ে থাকবে বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা, যা সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার একটি পথ তৈরি করল।

২০১১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় তারেক মাসুদের নিহত হওয়ার ঘটনায় তার স্ত্রীর করা ক্ষতিপূরণ মামলায় আজ রবিবার রায় দেন উচ্চ আদালত। তার মৃত্যুতে পরিবারের সদস্যরা স্নেহ ও ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ক্ষতিপূরণও পাবেন।

তারেক মাসুদের পরিবারের আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘স্বামীর স্নেহবঞ্চিত হওয়ায় এবং স্বামী-স্ত্রীর প্রাকৃতিক জীবন থেকে বঞ্চিত হওয়ায় ক্ষতিপূরণ পাবেন তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ। যত্ন, সুরক্ষা, পিতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হওয়ায় ক্ষতিপূরণ পাবে তারেক মাসুদের ছেলে নিষাদ মাসুদ। এ ছাড়া সামাজিক নির্ভরতা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় তারেক মাসুদের মা নুরুন নাহারও ক্ষতিপূরণ পাবেন।’ তিনি আশা করছেন, এ রায়ের মধ্য দিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার একটি পথ বের হলো।’

রায় ঘোষণার পর তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ বলেন, ‘এ রায়ের মধ্য দিয়ে আইনগতভাবে এটা স্বীকৃত হলো যে তথাকথিত দুর্ঘটনা আসলেই দুর্ঘটনা নয়। এর পেছনে চালক ও কোম্পানির দায় আছে। এমনকি ইন্সু্রেন্স কোম্পানিরও দায় আছে। এখন থেকে আশা করি অনেকেই ক্ষতিপূরণ পাবেন।’

ওই দুর্ঘটনায় মাসুদের সঙ্গে নিহত চিত্রপরিচালক মিশুক মনিরের পরিবারের পক্ষ থেকেও একটি ক্ষতিপূরণ মামলা করা হয়। মামলাটি আগামী ৪ ফেব্রুয়ারি শুনানির জন্য দিন নির্ধারণ রয়েছে।

দেশে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়। কিন্তু তাদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ঘটনা বিরল।

দুর্ঘটনা মামলায় দেশে শনিবারের রায়টিই সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ পাওয়ার রায়। এর আগে ১৯৮৯ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত দৈনিক সংবাদের বার্তা সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন মন্টু নিহত হওয়ার ঘটনায় ২০১০ সালে ২ কোটি ১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণের রায় দিয়েছিল হাইকোর্ট।

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হলেও সর্বোচ্চ সাজার বিধান নেই কোনো আইনে। সড়ক দুর্ঘটনায় কেউ নিহত হলে মামলা করতে হয় দণ্ডবিধির ৩০৪(খ) ধারায়। এই ধারায় সর্বোচ্চ সাজা তিন বছরের কারাদণ্ড।

সেন্টার ফর ইনজ্যুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশের (সিআইপিআরবি) জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয় ৬৪ জন, বছরে ক্ষতি ৩৪ হাজার কোটি টাকা। জরিপে দেখা যায়, প্রতি বছর বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৩ হাজার ১৬৬ জন নিহত হয়।

বেসরকারি সংগঠন নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির (এনসিপিএসআরআর) এক জরিপে দেখা যায়, ২০১৫-১৬ সালে দুই হাজার ৪৬৬ জন নারী ও শিশুসহ ১০ হাজার ২৩৫ জনের প্রাণহানি ঘটে সড়ক দুর্ঘটনায়। এ সময় সংঘটিত ৭ হাজার ৫৯০টি দুর্ঘটনায় আহত হয় অন্তত আরও ২২ হাজার ৫৯৮ জন।

সড়ক দুর্ঘটনায় তারেক মাসুদ নিহতের ঘটনায় তার পরিবারের পক্ষ থেকে করা মামলাটির রায় দেন বিচারপতি জিনাত আরা ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। গত বুধবার থেকে মামলাটির রায় ঘোষণা শুরু করে আদালত। রবিবার দুপুরে এই রায় ঘোষণা শেষ হয়।

রায়ের বিষয়ে ইন্সুরেন্স কোম্পানির আইনজীবী সৈয়দ মো. রায়হান উদ্দিন ঢাকাটাইমসকে বলেন, তারেক মাসুদ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের ঘটনায় তার পরিবার চার কোটি ৬১ লাখ ৭৫ হাজার ৪৫২ টাকা ক্ষতিপূরণ পাবেন। এর মধ্যে ১০ লাখ টাকা পাবেন তারেক মাসুদের মা। বাকি টাকা পাবেন তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ ও তার ছেলে।

রায় অনুযায়ী, বাসের চালক ৩০ লাখ, বীমা কোম্পানি রিলায়েন্স ৮০ হাজার এবং বাকি টাকা চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্সের বাস মালিককে আদায় করতে হবে। রায় প্রকাশের তিন মাসের মধ্যে টাকা পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

২০১৩ সালে তারেক মাসুদের পরিবারের পক্ষ থেকে ১০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলাটি করা হয়।

তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিনের পক্ষে ড. কামাল হোসেন ও সারা হোসেন, বাস মালিকের পক্ষে আব্দুস সোবহান তরফদার ও রিলায়েন্স ইন্সুরেন্সের পক্ষে ইমরান এ সিদ্দিকী ও এহসান এ সিদ্দিকী শুনানি করেন।

মামলার নথি সূত্রে জানা যায়, মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার জোকা এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীরসহ গাড়ির আরোহী পাঁচজন। তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসটির সঙ্গে চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্স বাসের সংঘর্ষের ওই ঘটনায় আহত হন আরও কয়েকজন। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করে।

পরে ২০১৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি নিহতদের পরিবারের সদস্যরা মানিকগঞ্জে মোটরযান অর্ডিন্যান্সের ১২৮ ধারায় বাসমালিক, চালক ও ইনস্যুরেন্স কোম্পানির বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ চেয়ে মানিকগঞ্জ জেলা জজ ও মোটর ক্লেইমস ট্রাইব্যুনালে দুটি মামলা করেন। এরপর মোকদ্দমা দুটি জনস্বার্থে হাইকোর্টে বিচারের জন্য সংবিধানের ১১০ অনুচ্ছেদ অনুসারে আবেদন করা হয়।

আপনার মতামত প্রদান করুন

টি মন্তব্য

Insurance Loans Mortgage

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by:

.