সোমবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৭ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
জকিগঞ্জ সরকারি কলেজ ছাত্রদলের আনন্দ মিছিল  » «   ছেলে মৃত্যুর ৪৩দিন পর ইন্তেকাল করেন বাবা; জানাযা আড়াইটায়  » «   জকিগঞ্জে নব বিবাহীত যুবকের বিষ পানে মৃত্যু  » «   এনজিও আশা’র কর্মকর্তা আলী হোসেনের মায়ের ইন্তেকালে শোক  » «   জকিগঞ্জ-সিলেট সড়ক সংস্কারের দাবিতে জকিগঞ্জে সমাবেশ  » «   এলংজুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দোয়া মাহফিল ও পুরস্কার বিতরণ  » «   ইনামতি স্টুডেন্ট এসোসিয়েশনের গণ গ্রন্হাগারের উদ্বোধন  » «   শাবিপ্রবিতে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদেরকে জেডএসও এর অভিনন্দন  » «   জকিগঞ্জ বাজারে ভাই ভাই হিরো ক্লাবের অফিস উদ্বোধন  » «   জকিগঞ্জ পৌর এলাকায় শুক্রবার সারাদিন বিদ্যুৎ থাকবে না  » «  

মুফতি হান্নানসহ তিন জঙ্গির ফাঁসি কার্যকর

3G-120170412171217

গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারে হরকাতুল জিহাদের (হুজি) শীর্ষ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নান ও তার দুই সহযোগী জঙ্গি শরীফ শাহেদুল বিপুল ও জঙ্গি দেলোয়ার হোসেন রিপনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে।

এক যুগেরও বেশি সময় আগে সিলেটে ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা চালিয়ে তিনজনকে হত্যার মামলায় তাদের মৃত্যুদণ্ডের চূড়ান্ত রায় দেন সর্বোচ্চ আদালত।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল জানান, বুধবার রাত ১০টায় গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী বাংলাদেশের শীর্ষ নেতা মুফতি হান্নান ও শরীফ শাহেদুল বিপুলকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।

একই সময়ে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে তাদের আরেক সহযোগী দেলোয়ার হোসেন রিপনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় বলে জ্যেষ্ঠ জেল সুপার ছগির মিয়া জানান।

তার আগে সন্ধ্যা ৬টা ৩৭ মিনিটে দুটি অ্যাম্বুলেন্স কারাগারে প্রবেশ করে। আর বিকেল ৪টার দিকে ডিআইজি প্রিজন তৌহিদুল ইসলাম কারাগারে প্রবেশ করেন।

কারা সূত্রে জানা যায়, ফাঁসি কার্যকরের জন্য প্রধান জল্লাদ রাজু ও তার দুই সহযোগীকে বাছাই করা হয়। সহযোগীরা হচ্ছেন যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত বন্দি শরীফুল ইসলাম ও ইকবাল হোসেন।

কাশিমপুর কারা কমপ্লেক্সের ইমাম মাওলানা হেলাল উদ্দিনকে আসামিদের তওবা পড়ান এবং ফাঁসি কার্যকরের জন্য মহড়াও দেওয়া হয়।

এর আগে বুধবার বেলা ২টার দিকে কারাবন্দি দুই ভাই মো. মহিবুল ও মো. আনিসের সঙ্গে মুফতি হান্নানের সাক্ষাত করান কারা কর্তৃপক্ষ। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত মহিবুল রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে এবং আনিস আছেন কাশিমপুর কারাগারে।

এর আগে সকালে মুফতি হান্নানের বড় ভাই আলি উজ্জামান মুন্সি, স্ত্রী জাকিয়া পারভিন রুমা, বড় মেয়ে নিশি খানম ও ছোট মেয়ে নাজরিন খানম তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বলে জানান মিজানুর।

অন্যদিকে সন্ধ্যা ৬টা ৫০ মিনিটে শেষ দেখা করতে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করেন রিপনের বাবা-মা ও স্ত্রীসহ পরিবারের ২৫ সদস্য। এদের মধ্যে বাবা আ. ইউসুফ, মা আজিজুন্নেছা, ভাই নাজমুল ইসলাম ও তার স্ত্রী রয়েছেন বলে কারা সূত্র জানিয়েছে। রিপনের গ্রামের বাড়ি মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের কোনাগ্রামে।

এর আগে ফাঁসি কার্যকরের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে কারা কর্তৃপক্ষ। বাড়ানো হয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সন্ধ্যার পর থেকে বন্ধ করে দেয়া হয় জেলরোড থেকে বন্দরবাজার পর্যন্ত সড়কে যান চলাচল।

সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ জেল সুপার ছগির মিয়া জানান, স্বজনরা বেরিয়ে আসার পর রিপনকে তওবা পড়ান সিলেট নগরের আবু তোরাব মসজিদের ইমাম মাওলানা মুফতি মো. বেলাল উদ্দিন। এরপর ফারুক আহমদ ও জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি জল্লাদ দল রিপনের ফাঁসি কার্যকর করবে।

অন্যদিকে মুফতি হান্নানের সহযোগী জঙ্গি শরীফ শাহেদুল বিপুলের সঙ্গে দেখা  ও লাশ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান তার বাবা হেমায়েত উল্লা।

যেভাবে ঘটনা ঘটে
২০০৪ সালের ২১ মে ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীকে লক্ষ্য করে গ্রেনেড হামলা চালিয়েছিল জঙ্গিরা। এ সময় তিনি সিলেটে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার মসজিদে জুমার নামাজ পড়ে বের হচ্ছিলেন। হামলায় পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক কামাল উদ্দিনসহ তিনজন নিহত হন। আনোয়ার চৌধুরী, সিলেটের তৎকালীন জেলা প্রশাসক আবুল হোসেন, জেলা আইনজীবী সমিতির তৎকালীন সভাপতি প্রয়াত আবদুল হাই খান, স্থানীয় সাংবাদিক মহিবুর রহমানসহ ৭০ জন আহত হন।

আনোয়ার চৌধুরী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার পাটালি ইউনিয়নের প্রভাকরপুর গ্রামে তাঁর পৈতৃক বাড়ি। তিনি ২০০৪ সালের ১৫ মে বাংলাদেশে ব্রিটিশ হাইকমিশনার হিসেবে নিযুক্ত হন। এর পাঁচ দিন পর সিলেটে গিয়ে গ্রেনেড হামলার শিকার হন।

মামলা এবং বিচার
গ্রেনেড হামলার ঘটনায় সিলেট কোতোয়ালি থানায় মামলা করে পুলিশ। তদন্তের শুরুতেই ঘটনা ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা ছিল বলে সে সময় অভিযোগ ওঠে। পুলিশ ঘটনার পর প্রথম নয় দিনে নয়জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে, যাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। পরে মামলাটি সিআইডিতে স্থানান্তর করা হয়।

মূলত ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে হুজির সিলেট অঞ্চলের সংগঠন শরীফ শাহেদুল আলমকে গ্রেপ্তারের পর এই হামলার ঘটনায় হুজি-বি ও মুফতি হান্নান জড়িত থাকার কথা জানতে পারে তদন্তকারী সংস্থা। এরপর তদন্ত গতি পায়। এরপর ২০০৫ সালের ১ অক্টোবর ঢাকায় মুফতি হান্নান গ্রেপ্তার হন।

এ ঘটনায় করা দুটি হত্যা ও বিস্ফোরক মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৭ সালের ৭ জুন। ২০০৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক সামীম মো. আফজাল মুফতি হান্নানসহ তিন আসামির মৃত্যুদণ্ড ও দুই আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।

এরপর আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের আবেদন) হাইকোর্টে শুনানির জন্য আসে। ২০০৯ সালে আসামিরা আপিল করেন। ৬ জানুয়ারি হাইকোর্টে শুনানি শুরু হয়। নয় দিন শুনানি নিয়ে গত ১১ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট রায় দেন। রায়ে বিচারিক আদালতে দেওয়া দণ্ড বহাল থাকে। গত বছরের ২৮ এপ্রিল হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। এরপর মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা তিন আসামির মধ্যে হান্নান ও শাহেদুল ১৩ জুলাই আপিল করেন। এই আপিলের ওপর ৩০ নভেম্বর শুনানি শুরু হয়। শুরুতে আপিল না করা আসামি দেলোয়ার হোসেন ওরফে রিপনের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত হিসেবে একজন আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়। ৬ ডিসেম্বর আপিলের ওপর শুনানি শেষ করে রায় দেন সর্বোচ্চ আদালত। রায়ে আদালত বলেন, ‘আপিল ডিসমিসড।’

আপিল বিভাগের রায় হাইকোর্ট হয়ে নিম্ন আদালতে যাওয়ার পর বিচারিক আদালত মৃত্যু পরোয়ানা জারি করে এবং তা গত ৩ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে পৌঁছায়। সেখানেই আসামিদের মৃত্যু পরোয়ানা পড়ে শোনানো হয়। এরপর গত ২৩ ফেব্রুয়ারি রিভিউ আবেদন করেন তিন আসামি। শুনানি শেষে রোববার আপিল বিভাগ তা খারিজ করে দেন।

কে এই মুফতি হান্নান
মুফতি আব্দুল হান্নান জঙ্গি সংগঠন হুজি-বি ও হরকাতুল মুজাহিদীনের অন্যতম শীর্ষ নেতা। সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা, ২১ শে আগস্ট গ্রেনেড বোমা হামলা, ২০০১ সালে রমনায় বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলাসহ সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী।

মুফতি হান্নানের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ায়৷ তার জবানবন্দি থেকে জানা যায়, তিনি গোপালগঞ্জের গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসা ও বরিশালের শর্ষিনা আলিয়া মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেন। এরপর ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেখানে দাওরা হাদিস পড়াকালে ১৯৮৭ সালে ওই দেশের আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক শিক্ষায় স্নাতকোত্তর পাস করেন।

পরের বছর ১৯৮৮ সালে তিনি পাকিস্তানে যান এবং করাচির জামিয়া ইউসুফ বিন নূরিয়া মাদ্রাসায় ফিকাহশাস্ত্রে ভর্তি হন৷ সেখান থেকে তিনি সীমান্তবর্তী শহর খোস্তে মুজাহিদ ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিয়ে আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধে আহত হয়ে তিনি পেশোয়ারে কুয়েত আল-হেলাল হাসপাতালে ১০ মাস চিকিৎসা নেন। এরপর করাচির ওই মাদ্রাসায় লেখাপড়া শেষ করেন।

মুফতি হান্নান ১৯৯৩ সালে দেশে ফেরেন এবং পাকিস্তানভিত্তিক হরকাতুল মুজাহিদীনের হয়ে তৎপরতা শুরু করেন। অবশ্য এর আগেই আফগানফেরত এদেশীয় মুজাহিদরা হুজি-বি গঠন করেন। মুফতি হান্নান ১৯৯৪ সালে হুজি-বিতে যোগ দেন। প্রথমে তিনি কোটালীপাড়া উপজেলার থানা প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পান। সাংগঠনিক দক্ষতায় অল্প দিনের মধ্যে তিনি হুজি-বির অন্যতম শীর্ষ নেতৃত্বে চলে আসেন। হুজিতে থাকার পাশাপাশি মুফতি হান্নান হরকাতুল মুজাহিদীনের হয়েও কার্যক্রম চালাতেন বলে জানা গেছে।

১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোরে উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলার মধ্য দিয়ে এ দেশে গোপন জঙ্গি সংগঠন হুজি-বির নাশকতা শুরু হয়। হুজি-বির কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সিদ্ধান্তে মুফতি হান্নান ও মুফতি আবদুর রউফের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় এ হামলা হয় বলে হান্নানের জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে। ওই হামলায় ১০ জন নিহত ও দেড়শ’জন আহত হন। যদিও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এ ঘটনায় বিএনপির নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ফলে জঙ্গিদের বিষয়টি তখন আড়ালেই থেকে যায়। এরপর একই বছরের ৮ অক্টোবর খুলনা শহরের আহমদিয়া মসজিদে বোমা হামলা হয়। তাতে আটজন নিহত হন।

২০০০ সালের জুলাইয়ে কোটালীপাড়ায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভাস্থলের কাছাকাছি ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রেখে প্রথম আলোচনায় আসেন মুফতি হান্নান ও তার দল। এরপর থেকে তিনি আত্মগোপনে থেকে তৎপরতা চালান।

২০০১ সালে ঢাকায় সিপিবির সমাবেশে, রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানসহ ছয়টি বোমা হামলার ঘটনা ঘটায় জঙ্গিরা। এরপর শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালায় ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে তাঁর সমাবেশে। এতে আওয়ামী লীগের ২২ জন নেতা-কর্মী নিহত হন। আহত হন শেখ হাসিনাসহ শতাধিক ব্যক্তি।

তার আগে ওই বছরের ২১ মে সিলেটে হজরত শাহজালাল (র.)-এর মাজারে বাংলাদেশে তৎকালীন ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর এবং ৭ আগস্ট সিলেটের তৎকালীন মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের ওপর গ্রেনেড হামলা চালায় হুজি-বির জঙ্গিরা। হান্নানের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় সর্বশেষ গ্রেনেড হামলা হয় ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জে এক সমাবেশে। ওই হামলায় আওয়ামী লীগের নেতা ও সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়াসহ পাঁচজন নিহত হন।

আপনার মতামত প্রদান করুন

টি মন্তব্য

Insurance Loans Mortgage

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by:

.