মঙ্গলবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০১৭ খ্রীষ্টাব্দ | ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

মানবতার অবক্ষয়

নাফছি জাহান::

অরুণিমার ছোট্ট সংসার। অরুণিমা,তার মেয়ে তরু আর বৃদ্ধা শাশুড়ি। মেয়েটার বয়স ৪/৫হবে। তিন বছর আগে অরুণিমার স্বামী একটি দুর্ঘটনায় মারা যায়। সেই থেকে মেয়ে আর শাশুড়ির দায়িত্ব অরুণিমাকেই নিতে হয়। স্বামীর রেখে যাওয়া দোতালা এই বাড়িটা আর অরুণিমার ছোট্ট একটি চাকরিতে সংসার চলছে। মেয়ে আর শাশুড়িকে নিয়ে দোতালায় থাকে অরুণিমা। দোতালায় ছোট্ট একটি রুম আছে, যেটা ভাড়া দিতে চাচ্ছে অরুণিমা। অরুণিমার মেয়েটি অনেক মিষ্টি, তোতা পাখির মতো সারাদিন কথা বলতে থাকে, অনেক চঞ্চল, মনে মায়া অনেক বেশি।

এক বিকেলে অরুণিমা রুম গোছানোর কাজে ব্যস্ত ছিলো, তরু মেঝেতে বসে খেলছিলো। হঠাৎ কলিংবেল বেজে ওঠে। অরুণিমা দরজা খোলার পর দু’জন লোককে দেখতে পায়। লোক দু’টি পাশের রুমটা ভাড়া নিতে চায়। অরুণিমা তাদেরকে ভেতরে এসে বসতে বলে। তাদের কে হালকা কিছু নাস্তা দেয়া হয়। তরু মেঝে থেকে উঠে লোকগুলির কাছে আসে এবং তাদের সাথে অনেক কথা আর দুষ্টুমি করতে চায়। খুব অল্প সময়ে লোকগুলির সাথে তরু মিশে যায়।
অরুণিমা আর তার শাশুড়ির সাথে কথা শেষে লোকগুলি চলে যায় এবং পরের দিন বিকেলে পাশের রুমটায় উঠে। তরু সুযোগ পেলেই তাদের রুমে চলে যেতো আর অনেক কথা বলতো, দুষ্টুমি করতো, হাসাহাসি করতো, লোকগুলিকে ঘোড়া বানিয়ে তাদের পিঠে চড়তো, ছাদে নিয়ে যেতো তাদের আর ছুটোছুটি, খেলাধূলা সবই করতো লোকগুলির সাথে। অরুণিমা নিষেধ করতো কিন্তু তরু বাচ্চা মেয়ে তাই শুনতো না।
অরুণিমার শাশুড়িও কোনো রকম হেঁটে লোকগুলির রুমে আসতো, গল্প করতো, ভালো কিছু রান্না হলে ওদের জন্য নিয়ে আসতো। এভাবে তরু আর তার দাদির সাথে লোকগুলির একটি মিষ্টি সম্পর্ক তৈরী হয়ে যায়। এভাবে বেশ কিছুদিন চলে যায়। কিন্তু লোকগুলির চলাচলে অরুণিমার মনে কিছুটা সন্দেহের উদয় হয়। অরুণিমা লক্ষ্য করে দেখে লোকগুলি অনেক রাত করে ফেরে, ব্যাগ ভর্তি কী যেনো নিয়ে আসে আবার ব্যাগ ভর্তি কী সব নিয়ে যায়।
চাকরির সুবাধে অরুণিমাকে বাইরে থাকতে হয় দানের অনেকটা সময় তাই এই ব্যাপারটার জন্য বেশি সময় দিতে পারেনা। তাছাড়া তরুর সাথেও একটি মধুর সম্পর্ক তৈরি হয় তাদের তাই তেমন কিছু বলতে পারেনা।
সেদিন শুক্রবার হঠাৎ বাড়ির চারপাশ পুলিশ ঘেরাও করে ফেলে। তরু আর তার দাদি লোকগুলির রুমেই ছিলো, তাদের সাথে গল্প করছিলো। পুলিশের শব্দ শুনে লোকগুলি সব বুঝতে পারে, হঠাৎ তারা পিস্তল বের করে একজন তরুর মাথায় আর অন্যজন দাদির মাথায় তাক করে। তারপর রুমের সামনে যেয়ে পুলিশকে বলে তাদের ছেড়ে দিতে। অরুণিমা আওয়াজ শুনে বাইরে বেরিয়ে আসে, মেয়ে আর শাশুড়িকে এমন অবস্থায় দেখে চিৎকার করতে থাকে। পুলিশের কথা শুনে অরুণিমা বুঝতে পারে লোকদুটি জঙ্গি দলের সদস্য। কোথাও একটা আক্রমণ করবে, তাই এখানে ভাড়া এসেছে। অরুণিমা লোকদুটির কাছে তার মেয়ে আর শাশুড়িকে ছেড়ে দেবার জন্য অনেক আকুতি- মিনতি করতে থাকে। কিন্তু কোনো কাজ হয়না। তাদের মুক্তি নেই বুঝতে পেরে তারা একজন অন্যজনের দিকে কী যেনো ইশারা করে আর হঠাৎ তরু আর তার দাদির মাথায় গুলি করে দেয়। তরু আর দাদির রক্তাক্ত দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। চারপাশ থেকে পুলিশের গুলি আসে এবং লোকদু’টিও রক্তাক্ত দেহে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। অরুণিমা চিৎকার করে তরু আর তার শাশুড়ির কাছে ছুটে আসে, আর তাদের জড়িয়ে কাঁদতে থাকে। পুলিশ চারজনের লাশ নিয়ে যেতে আসে। অরুণিমা যেনো পাথর হয়ে যায়। আর মনে মনে বলতে থাকে- এ কেমন মানবতা ? আমার ফুঁটফুঁটে মেয়েটি আর শাশুড়ি ওদের কতো ভালোবাসতো, ওদের সাথে সারাদিন মিশে থাকতো, কতো একটা মধুর সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল মেয়েটি আমার।
এ কেমন মানবতার অবক্ষয়? ওদের পাষাণ হৃদয়ে এক বিন্দু মায়ার উদয় হলোনা ! একবারও হাত কাঁপলনা! এখানে আমার মেয়েটি আর শাশুড়ির কী দোষ ছিলো? মানবতা আজ এতো নগণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে!

আপনার মতামত প্রদান করুন

টি মন্তব্য

Insurance Loans Mortgage

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by:

.