শনিবার, ২১ জুলাই, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ শ্রাবণ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

প্রবাসীর অন্তরজ্বালা : খালি ট্যাহা ট্যাহা ট্যাহা করো?


আনিসুর বুলবুল: প্রবাস জীবন বড়ই জটিল। মাঝে মধ্যেই আলো আধাঁরের বিষণ্ন এক ছায়া আর চাপধরা এক কঠিন নীরবতা হাহাকার গ্রাস করে নেয় প্রবাসীদের। অসহনীয় এক শূন্য একাকীত্ব মাঝ রাতেও প্রবাসীকে জাগিয়ে রাখে। দেশে আত্মীয়-স্বজন রেখে প্রবাসে যিনি থাকেন শুধুমাত্র তিনিই বিষয়টি বুঝতে পারেন।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে এক প্রবাসীর জীবনের চাপা কষ্ট ও রুঢ় বাস্ততা প্রকাশ পেয়েছে। ভিডিওটি দেখে আমার প্রবাস জীবনের কথা মনে পড়েছে বারবার। প্রবাসে থেকে দেশের ফোন কখনও মধুর; আবার কখনো বিধুর!

ভিডিওটি মধ্যপ্রাচ্যের। সম্ভবত ওমানের। একটি কারাভান শেয়ার করেন তিন প্রবাসী। সিঙ্গেল বেডে তাদের বসবাস। আমি যখন আবুধাবী ছিলাম; তখন প্রথমদিকে আমরা চার কলিগ একটি কারাভান শেয়ার করতাম। গভীর রাতে ফোনে ঘুম ভেঙে যায় ওই প্রবাসীর। তিনি ঘুম থেকে উঠে সিঙ্গেল বেডের খাটে বসে ফোনটি রিসিভ করেন।

– হ্যালো! কি হইছে?

দরদভরা কণ্ঠ। বোঝাই যাচ্ছিলো দেশ থেকে বউয়ের ফোন।

লোকটি চোখ মুছতে মুছতে বউকে বলেন,

– এখন কয়টা বাজে?

তার ঠিক সামনে যে প্রবাসী থাকেন। তিনিই এই ভিডিওটি করেছেন।

– ট্যাহা তো তোমাকে দুইমাস আগেই পাঠাইছি না?

ওপাশের কথা শুনে হঠাৎ লোকটির দরদভরা কণ্ঠ চেঞ্জ হয়ে যায়।

– খালি ট্যাহা ট্যাহা ট্যাহা করো? খালি ট্যাহা ট্যাহা ট্যাহা করো?

বুঝতে পারছিলাম। লোকটি তার বউয়ের ফোনে বিরক্ত হন। বউ ফোন করেই শুধু টাকা চান। তার রুমে যারা থাকেন। তারাও বিষয়টি অবগত। আর সেকারণেই তাদের একজন ভিডিওটি করেছেন।

– ট্যাহা তো পাঠামুই, কিন্তু বেতন না দিলে কি করতাম। খালি ট্যাহা ট্যাহা ট্যাহা করো?

ওপাশ থেকে হয়তো তার বউয়ের টাকার চাহিদা থামছেই না।

– ঘুমাইতেও দিতানা? তুমগো ঠেলায় ঠেলায় আমার চুলডি পর্যন্ত উইঠ্যাগেলো গা। বুজজো …

বলে লোকটি চুল উধাও হওয়া মাথায় হাত বুলাতে থাকেন। তারপর চিল্লাইয়া উঠেন!

– ওরে বাবারে বাবা! ট্যাহা না দিতে না পারলে বাংলাদেশে আইবার পারতাম না! কথার ইশটাইল কি? ট্যাহা কি বলদের পুন্দা দিয়া আহে?

মনে হলো! বউয়ের কথায় তিনি অস্থির-পেরেশান। সারাদিন কড়া রোদের মধ্যে পরিশ্রম করে রাতে যে একটু ঘুমাবে সেটাও পারছে না।

– ঘুমাইতে পারি না। খালি ফোন আর ফোন। ফোন আর ফোন। খালি ফোন আর ফোন!

তিনি তার বউকে বোঝাতে থাকেন-

– আমি ট্যাকা পয়সা পাঠাতে পারতাম না এহন। বেতন না পাইলে পাঠাতে পারতাম না।

ওপাশ থেকে হয়তো তার বউ অভিমান করে বলেছে তাকে আর ফোন দিবে না। লোকটি আরও উত্তেজিত হয়ে উঠেন।

– ও আচ্ছা .. আচ্ছা ফোন দিও না। হে আর ফোন দিবো না। ফোন দিলে দিবা। না দিলে না দিবা। খালি ট্যাকা ট্যাকা ট্যাকা! ট্যাকা কি বলদের পুন্দা আহে? ঘুমাইতে দেয় না।

এই পর্যায়ে রুমের অন্য প্রবাসীরা তাকে বাইরে গিয়ে কথা বলতে বলেন। তাদেরও তো ঘুমের ডিস্টার্ব হচ্ছে। ফের সকাল হলেই তো আবার কাজ আর কাজ। একজন বলেন,

– এই মিয়া বাইরে গিয়ে কথা কন না?

লোকটি তার সঙ্গেও উত্তেজিত হন-

– ক্যা। বাইরে গিয়ে কথা কইবো?

হঠাৎ লোকটি দাঁড়িয়ে যান। ফোনে চিল্লাইয়া উঠেন-

– ট্যাহা কামাইয়া দেহো? ট্যাহা কামাইয়া দেহো? তোমার লাইগা মান সম্মান সব শেষ অইয়া গেলো গা। হে জনে কয় আমার ফোন আহে।হে জনে কয় আমার ফোন আহে। হে জনে কয় আমার ফোন আহে। ফোন ফোন ফোন ফোন … মোবাইল আমি আজ ভাইংগাই ফালাইমু।

বলেই লোকটি তার স্মার্টফোনটি মেঝেতে আছাড় মারেন। তারপর বেডের নিচ থেকে পান-সুপারি সেচার হামান দিস্তা দিয়ে মোবাইলটি সেচতে থাকেন। আর কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলতে থাকেন-

– মোবাইল রাখতাম না আর। মোবাইল আর রাখতাম না।

কিন্তু তার মোবাইলটি ভাঙছিল না। তখন তিনি বেডের নিচে পেয়ে যান হাতুড়ি। এরপর তিনি হাতর দিয়ে পিটিয়ে তার মোবাইলটি ভেঙে ফেলে তার বেডে গিয়ে শুয়ে পড়েন।

সকাল থেকে ভিডিওটি বারবার দেখেছি আমি। ৪৫ ডিগ্রি রোদে কাজ করার স্মৃতি বারবার উঁকি দিচ্ছিল আমার। এক প্রবাসীর কষ্ট আরেক প্রবাসীকে গ্রাস করবেই। হঠাৎ হাত চলে যায় চোখের কোণে … আঙুল বুঝতে পারে সেখানে পানি গড়িয়ে পড়ছে!

অনেকেই ভিডিওটি শেয়ার করেছেন তাদের ওয়ালে। লিখছেন, প্রবাসী জীবনের বাস্তবতা। আবার কেউ লিখেছেন, সত্যি বলতে এটাই হলো এক জন প্রবাসীর দুঃখ।

সঙ্গত কারণে ভিডিওটি শেয়ার করা হলো না।

আপনার মতামত প্রদান করুন

টি মন্তব্য

Insurance Loans Mortgage

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by:

.