সোমবার, ২২ জানুয়ারি, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৯ মাঘ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
বাদেজমার ক্যান্সার আক্রান্ত সিহাবের আর্থিক সহায়তা কামনা  » «   সেই বর্ণা মারা গেলেন  » «   কসকনকপুরে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্মদিন উদযাপন  » «   পাঠানচক প্রবাসী জনকল্যাণ সংস্থার বৃত্তি ও শিক্ষা উপকরণ প্রদান  » «   আনজুমানে আল ইসলাহ ফ্রান্সের উদ্যোগে আল্লামা ছাহেব কিবলাহ ফুলতলী (রহঃ) এর ঈছালে সাওয়াব মাহফিল অনুষ্ঠিত  » «   জকিগঞ্জ ঐক্য পরিষদ ফ্রান্সের ৪র্থ বর্ষপূর্তি ও দ্বিবার্ষিক কার্যকরী কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠান সম্পন্ন:  » «   ঈসালে সাওয়াব মাহফিলে আল্লামা ইমাদ উদ্দিন ফুলতলী ; বিপন্ন মানুষের সেবায় এগিয়ে আসুন  » «   আল্লামা ফুলতলী ছাহেব (র.)’র ১০ম ইন্তেকাল বার্ষিকী আজ:: প্রস্তুত জকিগঞ্জে ঐতিহাসিক বালাই হাওর  » «   ছেলে হত্যার বিচার চান সালমানের মা বাবা  » «   জকিগঞ্জে রয়েল ট্রাভেলস এর উদ্বোধন  » «  

পরচর্চা নৈতিক স্বাস্থ্যের পক্ষে ভয়ানক ক্ষতিকারক

‘চুরি করা মহাপাপ’ জেনেও কিছু মানুষ হরদম চুরি করে। মিথ্যা বলা মহাপাপ জেনেও আমরা হড়হড় করে মিথ্যা বলি। তাই মুখে যত পরচর্চা-পরনিন্দাকে ‘ছি-ছি’ করি না কেন, পরনিন্দা আমরা সবাই করে থাকি। সানন্দে করি, উত্তেজনার সঙ্গে করি এবং উপভোগ করি

‘চর্চা’ শব্দটা উত্তম, অর্থবহ। আলোচনা, পড়াশোনা, অভ্যাস, অনুশীলন, গবেষণা ইত্যাদি ভালো অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত হয়। জ্ঞানবিজ্ঞানচর্চা, সাহিত্যচর্চা, শরীরচর্চা, ধর্মচর্চাÑ এসব ক্ষেত্রে ‘চর্চা’ শব্দ চড়চড় করে মর্যাদার উঁচু চেয়ারে বসে আছে। কিন্তু শব্দটির মাথায় যে-ই না বসল ‘পর’ শব্দটি, সঙ্গে সঙ্গে ধপাস করে পতন। তখন তিনি পরচর্চা। যার সহজ ব্যবহারিক অর্থ হলো পরনিন্দা।
শব্দের অধঃপতন ঘটল ঠিকই, কিন্তু বিষয়টি হয়ে উঠল দারুণ সুস্বাদু, লোকপ্রিয়, আর লোভনীয়। পরনিন্দা তো একটি মহাদোষ। এটাকে আমি জনপ্রিয়, লোকপ্রিয় বলছি বলে কেউ কেউ হয়তো মন ভারী করবেন। তা করুন। কিন্তু মনে রাখবেন, ‘চুরি করা মহাপাপ’ জেনেও কিছু মানুষ হরদম চুরি করে। মিথ্যা বলা মহাপাপ জেনেও আমরা হড়হড় করে মিথ্যা বলি। তাই মুখে যত পরচর্চা-পরনিন্দাকে ‘ছি-ছি’ করি না কেন, পরনিন্দা আমরা সবাই করে থাকি। সানন্দে করি, উত্তেজনার সঙ্গে করি এবং উপভোগ করি। দাদ একটা ঘৃণ্য পচা রোগ; কিন্তু দাদ চুলকানোয় সুখ আছে!
এমন কেউ আছে নাকি যিনি পরচর্চা করেন না? Ñআছেন বৈকি। ব্যতিক্রম সবক্ষেত্রে থাকে, কিন্তু ব্যতিক্রম প্রমাণ বা দৃষ্টান্ত নয়। শতকরা হয়তো পাঁচ বা ১০ জন পরনিন্দা করেন না। মজার কথা হলো, বাকি ৯৫ জনই নিজেদের ওই পার্সেন্টের একজন বলে মনে করেন! ওই ৯০ থেকে ৯৫ জনই বলেন, ‘পরনিন্দা করা আমার কপালে লেখা নাই। ওসব আমি কখনও করি না।’ লেখক যাযাবরের সে উক্তিটি মনে পড়ে, ‘কৃতজ্ঞতা কথাটি আছে ইংরেজের ভাষায়, নেই তার চরিত্রে।’ ঠিক তেমনই বলা চলে, পরচর্চা করার অভ্যাসটি আছে ওই ৯৫ ভাগের চরিত্রে; কিন্তু ওটা লেখা নেই তাদের কপালে। আমাদের জ্ঞানীগুণীজনরা বলেছেন, ‘হে মানুষ, তুমি আত্মসমালোচনা কর। নিজের দোষ খুঁজে বের কর।’ মানুষ তা-ই করছে। জ্ঞানী-মহাজ্ঞানীরা বলেছেন, সর্বভূতকে আত্মবৎ অর্থাৎ আপন অভাবে। সুতরাং রামা-শ্যামা, কটাই-মজুর, মন্ত্রী-দারোগা, নেতা-চোর, বন্ধু-সহকর্মী, সহপাঠী, পাড়াপ্রতিবেশী, পুত্রবধূ, শ্বশুর, শাশুড়ি, ননদ, ভাবি, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, অধস্তন কর্মী, পাড়ার দোকানদারÑ এক কথায় চারপাশের সর্বভূত অর্থাৎ সবাই তো আমার আত্মবৎ। ওদের সমালোচনা করা, ওদের দোষত্রুটি খুঁজে বের করে ওদের পি-ি চটকানোর নামই আসলে আত্মসমালোচনা। ওরা কি আমার পর!
পরচর্চা, পরনিন্দা হচ্ছে এক ধরনের বিনোদন মানে অ্যামিউজমেন্ট। প্রায় সবধরনের অ্যামিউজমেন্টের জন্য সরকারকে ট্যাক্স দিতে হয়। এমনকি কাউকে মারলেও ট্যাক্স লাগে। একবার এক বীরপুরুষ স্ত্রীকে মেরে কোর্টে যেতে বাধ্য হয়েছিল। বিচারককে সে বললÑ হ্যাঁ, সে তার স্ত্রীকে মেরে হাতের সুখ মিটিয়েছে। তখন বিচারক রায় দিয়ে বললেন, মহিলাকে আহত করার জন্য ছয় মাসের জেল। সেই সঙ্গে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে। লোকটি বলল, সাজা তো পেলাম ছয় মাসের জেল; কিন্তু হুজুর ওই পাঁচ হাজার টাকা কীসের জন্য? বিচারক বললেন, ওটা হাতের সুখ মেটানোর জন্য অ্যামিউজমেন্ট ট্যাক্স!
কিন্তু পরচর্চা নামের বিনোদনটি বিনা ট্যাক্সে যখন খুশি, যত খুশি করা যায়। সেই পৌরাণিক যুগ থেকে পরচর্চা বিনোদনের কাজ করে চলেছে। কিছুদিন আগে গ্রামগঞ্জের পুকুরঘাট ছিল মেয়েদের আড্ডার জায়গা। ওখানে পরচর্চার একেবারে পরকাষ্ঠা দেখা যেত। এখন গ্রামাঞ্চলে পানির নল কলনির্ভর হয়ে যাওয়ায় সে পরচর্চার স্থানটি লুপ্ত হয়েছে। রক, বারান্দা, ক্লাবঘর, বৈঠকখানা, পাবলিক পাঠাগার, চায়ের দোকান ও নাম করা কিছু আড্ডাস্থলে হয়ে থাকে নানা বিষয়ে চর্চা। পরচর্চা ছাড়া অন্য বিষয়ে চর্চায় থাকে না তেমন ঝাল-টক-মিষ্টি। আর সেসব চর্চায় ‘ইলম’ লাগে। দরকার হয় বিদ্যাবুদ্ধির। তাই সেগুলো তেমন জমে না। সে কারণে চর্চাটি ঘুরেফিরে পৌঁছে যায় আসল স্টেশনে। আর যেই মাত্র চর্চা শুরু হলো পরের, অমনি সবার মুখ গেল খুলেÑ সবার স্টকে রয়েছে দুনিয়ার তাবৎ লোকের সব তাজা তাজা হাঁড়ির খবর। শুরু হয়ে গেল অন্তহীন বিনোদন। স্বপ্নে পোলাও রাঁধতে কেউ কি ঘি ঢালতে কার্পণ্য করে! তেমনি চর্চা যখন শুরু হয় পরের, তখন তিলকে তাল, নারিকেলকে সর্ষে, নরকে বানর বানাতে বাধা কোথায়!
আমাদের ভাষায় ‘রাজা-উজির মারা’ বলে একটা কথা আছে। অনেকেই রাজা-উজির মেরে থাকেন। এমনিতেই রাজা-উজির মারা যায়, তা সহজ কর্ম নয়। কিন্তু অতিসহজে তাদের মারা যায় শুধু ওই পরচর্চার বধ্যভূমিতে। বসে গেলাম কয়েকজন সেখানে, তারপর বাস্তবে যাদের নাগাল পাব না, পেলেও তাদের সামনে ‘টুঁ’ শব্দটি করতে পারব না, শুরু করলাম তাদের চর্চা, মানে নিন্দা। এরপর ওদের মেরেকেটে, ল্যাং মেরে ধরাশায়ী করে, কুপোকাত করে, নরাধম বানিয়ে আহা কী সুখ! কী সুখ!
এমনিতে যদি লাঠি, চাকু, বন্দুক নিয়ে মারতে যাই, তবে কিন্তু নিজে মরার সম্ভাবনাও থাকে। তার ওপর পুলিশ, কোর্টকাচারির আঠারো ঘা অবধারিত। কিন্তু পরচর্চার আসরে প্রতিপক্ষকে যত মার, যত খুশি ঘায়েল কর, কোনো ঝঞ্ঝাট নেই। যাকে মারলাম, ঘায়েল করলাম, তার কোনো ক্ষতি হলো না, আমারও তো কোনো ক্ষতি হলো না; উপরন্তু লাভ হলোÑ দাদ চুলকানোর সুখের মতো মানসিক অসুখ চুলকানোর সুখ! সুতরাং পরচর্চা এমন আর কী মন্দ!
কোনো আড্ডায় যখন সাপের দংশন অথবা ভূতের গল্প শুরু হয়, তখন উপস্থিত সবাই একটা না একটা নিজস্ব অভিজ্ঞতার কথা বলবেন। আর আপনার কোনো অসুখ করলে আপনার সব চেনাজানা লোক, বন্ধুবান্ধব সবাই আপনাকে কোনো না কোন ওষুধের প্রেসক্রিপশন দেখে দেবে। তখন আপনার মনে হবে, একমাত্র আপনি ছাড়া পৃথিবীর আর সবাই ডাক্তার, কবিরাজ, হাকিম, ওঝা, তান্ত্রিক, টোটকাবিশারদ! ঠিক তেমনি পরচর্চাÑ যার বিষয়ে চর্চা হয় ওই অনুপস্থিত লোকটির কোনো না কোন দোষত্রুটি, কেলেঙ্কারি, কুকর্মের গল্প চর্চাকারীদের সবার জানা।
বলা হয়, পেন ইজ মাইটিয়ার দেন সোর্ড। অর্থাৎ অসির চেয়ে মসির শক্তি বেশি। ঠিক তেমনি নিন্দাও কম শক্তিশালী নয়। সহজে বলা চলে, নিন্দুক ইজ মোর পাওয়ারফুল দেন বন্দুক। এতসব ভালো দিক থাকলে কিন্তু একটা উপদেশ নৈতিক কারণে দিতে হয়। যেমন প্রতিটি সিগারেটের প্যাকেটে লেখা থাকেÑ ‘ধূমপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকারক’, তেমনি আমাদের জানা উচিত, পরচর্চা নৈতিক স্বাস্থ্যের পক্ষে ভয়ানক ক্ষতিকারক।

আপনার মতামত প্রদান করুন

টি মন্তব্য

Insurance Loans Mortgage

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by:

.