মঙ্গলবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০১৭ খ্রীষ্টাব্দ | ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

পরচর্চায় নিজের ক্ষতি!

রাবেয়া (ছদ্মনাম) বেশ বন্ধুবৎসল। সমস্যা একটাই তাঁর। অতিরিক্ত পরচর্চার কারণে বন্ধুবান্ধব বা আত্মীয়স্বজন কারও কাছেই বিশ্বস্ত নন। কথা বলার সময় মনে হয় আশপাশে সব কদর্য, নেতিবাচক মানুষের ভিড়, জীবন যেন পঙ্কিলতায় ভরা।
ঠিক একই কারণে রাশেদ (ছদ্মনাম) কথাবার্তায় খুব চটপটে আর চৌকস হওয়া সত্ত্বেও বন্ধু হিসেবে মোটেও জনপ্রিয় নন। কেউ কেউ মনে করেন, হালকা একটু পরচর্চা করলাম, কী ক্ষতি তাতে? এটা তো মজাই। অনেকে বন্ধুবেশে কাছে এসে আপনার দুর্বলতম কথাটি শুনে নিয়ে অন্যকে বলে বেড়ান। কারও করা সামান্য পরচর্চা বা পরনিন্দা অন্যের মানসিক, পারিবারিক জীবনকে দুর্বিষহ করে দিতে পারে। তখন আর এটায় মজা থাকে না। আর সেই খেয়াল বেশির ভাগ মানুষের থাকে না।

পরচর্চায় ক্ষতি কী?
পরচর্চা এমনই এক নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য, যাতে যাঁর সমালোচনা করা হচ্ছে, শুধু তিনিই যে ক্ষতিগ্রস্ত হন এমন নয়, পরচর্চাকারী নিজেও ক্ষতিগ্রস্ত হন। মনে রাখতে হবে, পরচর্চাকারী কাউকে ছোট করে সাময়িকভাবে অন্যদের মনোযোগ আকর্ষণ করলেও তাঁরা কখনোই কারও শ্রদ্ধাভাজন হয় না।
যাঁর সমালোচনা করা হচ্ছে, তিনি যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন—
* মনোবল নষ্ট বা মন ছোট হতে পারে।
* পারিবারিক বা সামাজিক অবস্থান নষ্ট হতে পারে।
* আত্মবিশ্বাস বা আত্মমর্যাদা কমে যেতে পারে।
•* বিষণ্নতা তৈরি হতে পারে।
* পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট হতে পারে।
পরচর্চাকারীর সম্পর্কেও একই রকম নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।

পরচর্চা কেন করে মানুষ?
কোনো একজনের অনুপস্থিতিতে তাঁকে নিয়ে অহেতুকভাবে সবার কাছে ছোট করা, হেয় করা, মজা করা অথবা না জেনে একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলা—সবই পরচর্চা। পরনিন্দা বা সমালোচনার মাধ্যমে নির্দিষ্ট মানুষকে বারবার আলোচনার কেন্দ্রে রাখি। কোনো না কোনো কারণে গুরুত্বপূর্ণ বা চ্যালেঞ্জিং মনে করি। ব্যক্তির সাফল্য, দক্ষতা, আর্থিক বা সামাজিক অবস্থান, সৌন্দর্য, আত্মবিশ্বাস, জনপ্রিয়তা, সততা, নিশ্চিত পারিবারিক জীবনসহ নানা কিছু আমাদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। আড়ালে তাঁকে হেয় করার প্রবণতা তৈরি করতে পারে।
খুব মোটা দাগে অন্যকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করার মাধ্যমে আড্ডায় সবার মনোযোগ আকর্ষণ করা বা তথাকথিত স্মার্টনেস দেখানো উদ্দেশ্য হলেও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অন্য কথা বলে।
এ ধরনের আচরণ মূলত প্রকাশ করে পরচর্চাকারীর অবচেতন মনের অন্তর্নিহিত অনিরাপত্তাবোধ ও হীনম্মন্যতাবোধ (গভীরে প্রথিত)। যাঁকে নিয়ে পরচর্চা করা হচ্ছে, তাঁর প্রতি সূক্ষ্ম বা স্থূল ঈর্ষা বা হিংসারও প্রকাশ ঘটে।
এ রকম মনস্তত্ত্ব আমাদের মনে যে উদ্বেগ বা অস্বস্তি তৈরি করে, পরচর্চায় অন্যকে ছোট করার মাধ্যমে সেটা প্রশমনের একটা চেষ্টা চলে। আমাদের মনস্তত্ত্বের এই একধরনের অপরিপক্ব ‘ডিফেন্স’। সোজা কথায় বলা যায়, পরচর্চায় অন্যকে ছোট করার চেষ্টা করা হলেও ব্যক্তি মূলত নিজেকেই ছোট করেন এবং নিজের অপরিপক্বতা প্রকাশ করেন।
এ ধরনের ত্রুটিপূর্ণ বৈশিষ্ট্য সাধারণত শৈশবে বেড়ে ওঠার সময়ই তৈরি হয়ে যায়। সন্তানের সামনে অন্যদের সমালোচনা করা, অসম্মান করা বা মজা করা, সন্তানকে হেয় করে কথা বলা ত্রুটিপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের উদাহরণ। আবার অন্যদের সঙ্গে নেতিবাচকভাবে তুলনা, স্কুলে সহপাঠীদের উত্ত্যক্ত করলে বন্ধুদের কাছ থেকে বাহবা পাওয়া, বেড়ে ওঠার সময় অন্যদের উত্ত্যক্ত করা বিষয়ে স্কুল বা পরিবার থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট মূল্যবোধ বা নির্দেশনা না থাকাও হীনন্মন্য করে ফেলে।

পরচর্চা সামাল দেবেন কীভাবে?
যে মানুষ আড়ালে আপনার পরচর্চায় মেতে আছেন, কোনো না কোনো কারণে আপনি তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ এবং উদ্বেগের কারণ। কাজেই তিনি যতই চৌকস বা সফল হোন না কেন, কোনো না কোনোভাবে আপনার চেয়ে পিছিয়ে আছেন।

যা করবেন—
* পেছনে আপনাকে নিয়ে কে কী বলে সেটা নিয়ে সময় নষ্ট না করে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করুন।
* সামাজিক মেলামেশা বাড়ান। মানুষকে আপনাকে জানার সুযোগ দিন।
* নিজের ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলো আবার দেখুন এবং আস্থা রাখুন।
* পরচর্চাকারীর সঙ্গে দ্বন্দ্বে না জড়িয়ে সরাসরি বিষয়টা নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারেন। আবার তাঁর সঙ্গে সম্পর্কের উষ্ণতা কমিয়ে দিয়ে তাঁকে বুঝিয়ে দিতে পারেন—এ ধরনের আচরণ আপনার কাছে গ্রহণযোগ্য না।

যা করবেন না—
* নিজেকে অন্যদের কাছ থেকে বা কাজ থেকে গুটিয়ে নেবেন না।
* অযাচিতভাবে নিজেকে সঠিক প্রমাণ করা থেকে বিরত থাকুন।
* প্রতিক্রিয়া হিসেবে পরচর্চাকারীর বিরুদ্ধে একই রকম আচরণে লিপ্ত হবেন না।

মেখলা সরকার
সহযোগী অধ্যাপক
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা।

(প্রথম আলাে)

আপনার মতামত প্রদান করুন

টি মন্তব্য

Insurance Loans Mortgage

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by:

.