রবিবার, ২৪ জুন, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ১০ আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
২২টি গ্রামে বৃহত্তর ইছামতি কালিগঞ্জ প্রবাসী কল্যাণ সংস্থা’র ঈদ সামগ্রী বিতরণ  » «   সোনাপুর-সুপ্রাকান্দি ডেভল্যাপমেন্ট সোসাইটির ঈদ সামগ্রী বিতরণ  » «   কাতারে জকিগঞ্জের আব্দুল মুহিম মিনুর মৃত্যু  » «   জকিগঞ্জে ১৩০বোতল অফিসার চয়েজসহ মাদক ব্যবসায়ী আটক  » «   শাহ মোঃ ফয়ছল চৌধুরী কল্যাণ ট্রাস্টের উদ্যোগে ঈদ সামগ্রী বিতরণ সম্পন্ন  » «   বৃহত্তর আটগ্রাম প্রবাসী সমাজ কল্যাণ পরিষদের ঈদ সামগ্রী বিতরণ  » «   প্রতিবন্ধী ও দরিদ্রদের মধ্যে স্পেন প্রবাসী মাসহুদের ইফতার  » «   ইউএনও শহীদুল হকের ইন্তেকালে এইচটিএ সেবা ফাউন্ডেশনের শোক  » «   জকিগঞ্জে এমপি প্রার্থী এম জাকির হোসাইনের সমর্থনে ইফতার  » «   জকিগঞ্জের সাবেক ইউএনও শহীদুল হকের দাফন  » «  

নেপালে বাংলাদেশি বিমান বিধ্বস্ত নিহত অন্তত ৪৯


নেপালের কাঠমান্ডুতে বাংলাদেশের ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়ে কমপক্ষে ৪৯ জন নিহত হয়েছেন। ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া বিমানটিতে চার জন ক্রুসহ ৭১ জন আরোহী ছিলেন। যাত্রীদের মধ্যে ৩২ জন বাংলাদেশি, ৩৩ জন নেপালি এবং চীন ও মালদ্বীপের একজন করে নাগরিক ছিলেন। ২২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১০ জন বাংলাদেশি বলে গতরাতে নিশ্চিত করেছেন নেপালে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামস। আরো বাংলাদেশি কোন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন কি-না তা জানতে অনুসন্ধান চলছে বলে জানান তিনি।

চিকিৎসাধীন যাত্রীদের নাম পাওয়া গেলেও নিহতদের বিস্তারিত তথ্য নেপাল ও ইউএস বাংলা কর্তৃপক্ষ জানাতে পারেনি। তবে ২৫ জন বাংলাদেশি নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। নেপালে বাংলাদেশি বিমান দুর্ঘটনায় পড়ার পর দেশজুড়ে উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে। এদিকে হতাহতের ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী খাগড়া প্রসাদ শর্ম ওলি। ঘটনা অনুসন্ধানে কমিটি করেছে নেপাল কর্তৃপক্ষ। ইউএস বাংলার বিমান দুর্ঘটনায় পড়ার পর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান উঠানামা বন্ধ করে চালানো হয় উদ্ধার তৎপরতা। কী কারণে বিমানটি দুর্ঘটনায় পড়ে তার বিস্তারিত তথ্য না পেলেও নেপালের বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করেছে বিমানের পাইলট নির্দেশনা না মেনে ভুল দিক থেকে অবতরণ করেছিলেন। পাল্টা অভিযোগ করে ইউএস বাংলা কর্তৃপক্ষ বলেছে, বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে বিভ্রান্তিকর বার্তা দেয়া হয়েছিল।

বিধ্বস্ত বিমানটির জীবিত ১৯ জন যাত্রীর নাম প্রকাশ করা হয়েছে। ইউএস বাংলা এ তালিকা প্রকাশ করেছে। ইউএস বাংলা জীবিত যেসব যাত্রীকে শনাক্ত করেছে তারা হলেন- ইমরানা কবির হাসি, কবির হোসেন, মেহেদী হাসান, রিজওয়ানা আব্দুল্লাহ, স্বর্ণা সাঈদা কামরুন নাহার, শাহরিন আহমেদ, মো. শাহীন বেপারি, মো. রিজওয়ানুল হক, প্রিন্সি ধামি, সামিরা বায়জানকার, কিশোর ত্রিপাটি, হরিপ্রসাদ সুবেদী, দয়ারাম তামরাকার, কিষাণ পান্ডে, আশিস রঞ্জিত, বিনোদ পৌদাল, সনম সখ্য, দিনেশ হুমাগাইন, বসন্ত বহরা।

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বেলা ১২টা ৫২ মিনিটে ইউএস বাংলার ফ্লাইট বিএস ২১১ রওনা দিয়ে নেপাল সময় বেলা ২টা ২০ মিনিটে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণের সময় রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ে। এ সময় বিমানটিতে আগুন ধরে যায়। টেলিভিশন ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায় আগুনে বিমানের পিছনের ডানা ও সামনের কিছু অংশ ছাড়া পুরো পুড়ে যায়। নেপালের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের ডিজি সঞ্জিব গওতমের বরাত দিয়ে কাঠমান্ডু পোস্ট জানায়, ড্যাস-৮ কিউ৪০০ মডেলের ওই উড়োজাহাজ ত্রিভুবনে নামার কথা ছিল রানওয়ের দক্ষিণ দিক দিয়ে। কিন্তু সেটি নামার চেষ্টা করে উত্তর দিক দিয়ে। ধারণা করা হচ্ছে, পাইলট কোনো ধরনের কারিগরি জটিলতায় পড়েছিলেন। দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকারীরা উদ্ধার তৎপরতায় নামেন। এ কাজে যোগ দেয় নেপালের সেনাবাহিনীও। আহতদের উদ্ধার করে নেয়া হয় কাঠমান্ডু মেডিকেল কলেজ, টিচিং হাসপাতাল, নোরভিচ হাসপাতাল ও মেডিসিটি হাসপাতালে। হাসপাতালে নেয়ার পর আট জনের মৃত্যু হয়। বিধ্বস্ত বিমানটির ব্লাকবক্স উদ্ধার করা হয়েছে। নেপালি নাগরিকদের মধ্যে ১৩ জন ছিলেন সিলেটের রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী। ফাইনাল পরীক্ষা শেষে ছুটি কাটাতে একসঙ্গে দেশে ফিরছিলেন। তাদের মধ্যে দুই জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বলে কলেজ কর্তৃপক্ষ জানতে পেরেছে। বাকিদের ভাগ্যে কি ঘটেছে তার কিছুই জানা যায়নি।

বিমানটি যখন আছড়ে পড়ে তখন নিজের বাসভবন থেকে এ দৃশ্য দেখছিলেন আমান্ডা সামারস। তিনি স্কাই নিউজকে বলেছেন, ঘটনার সময় বিমানটি অনেক নিচু দিয়ে উড়ছিল। মনে হচ্ছিল, তা পাহাড়ের ভেতর দিয়ে উড়ে যাবে। বিমানটি রানওয়ে স্পর্শ করেছিল কিনা সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তিনি বলেছেন, অকস্মাৎ তাতে একটি ‘ব্লাস্ট’ হলো। এরপর আরো একটা। ওদিকে ত্রিভুবন বিমানবন্দরের জেনারেল ম্যানেজার রাজ কুমার ছেত্রি দ্য হিমালয়া’কে বলেছেন, বিধ্বস্ত বিমানের পাইলটের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল থেকে। বিমানটির অবতরণ করার কথা ছিল রানওয়ে-২ তে। এটি বিমানবন্দরের দক্ষিণ দিকে। বিমানটির করুণ পরিণতি ভোগ করার কয়েক মুহূর্তে এ ঘটনা ঘটে। এরপরই পাইলট জানান, তিনি উত্তর দিকের রানওয়েতে যেতে চান। কিন্তু বিমানটি তার পরিবর্তে যেতে থাকে উত্তর-পূর্ব দিকে। এ সময় পাইলটের সঙ্গে কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে যোগযোগ করা হয়। তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, কোনো সমস্যা আছে কিনা। জবাবে তিনি বলেন, সবকিছু ঠিক আছে। ওদিকে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ফলে ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটের ফ্লাইট বাতিল করা হয়। খবর পেয়ে বিমানবন্দরে ছুটে যান নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ঈশ্বর পোখরেল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাম বাহাদুর থাপা এবং নেপালে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামস। নেপালি কংগ্রেসের সিনিয়র নেতা রাম চন্দ্র পাউদেলও বিমানবন্দরে যান। প্রধানমন্ত্রী কেপি ওলি প্রাণহানির ঘটনায় শোক প্রকাশ করেন। যারা জীবিত আছেন তাদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছেন।

দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা দিতে একটি প্রতিনিধি দল ও চিকিৎসা সামগ্রী পাঠানোর কথা জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এদিকে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে সিঙ্গাপুর সফর সংক্ষিপ্ত করে আজ দেশে ফিরছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাতে দফায় দফায় সংবাদ সম্মেলন করে দুর্ঘটনার বিস্তারিত জানায় ইউএস বাংলা কর্তৃপক্ষ। সর্বশেষ দেয়া তথ্য অনুযায়ী বিমানের পাইলট আবিদ সুলতান প্রাণে বেঁচে যান। তবে অন্য তিন ক্রু নিখোঁজ ছিলেন। ইউএস বাংলার প্রধান নির্বাহী ইমরান আসিফ ব্রিফিং এ বলেন, বিমানটি অবতরণের আগে বিভ্রান্তিকর বার্তা দেয়া হয়েছিল কন্ট্রোল রুম থেকে। এদিকে ইউএস বাংলা জানিয়েছে, ওই বিমানের যাত্রীদের স্বজনদের নিয়ে আজ সকালে ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু একটি বিশেষ ফ্লাইট যাবে। ওই ফ্লাইটে পাসপোর্ট থাকা স্বজনরা ইউএস বাংলার তত্ত্বাবধানে সেখানে যেতে পারবেন। এ ছাড়া তাদের কার্যালয় থেকেও সর্বশেষ তথ্য সব সময় জানা যাবে। এদিকে রাতে ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের বারিধারার কার্যালয়ে যান ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। পরে তিনি সাংবাদিকদের জানান, বিমানে ৩৩ জন বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন। তাদের মধ্যে ১৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে মন্ত্রী বলেন, বিমানের প্রত্যেক যাত্রী বিমানের আওতায় ছিলেন। এ ছাড়া তারা জানিয়েছে, নিহতদের লাশ তারা নিজ ব্যবস্থাপনায় দেশে এনে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করবে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করতে কমিটি করার জন্য বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রীর প্রতিও আহ্বান জানান তিনি।

ডাক্তার, ওষুধ নিয়ে ঢাকা থেকে বিমান যাচ্ছে: এদিকে বিমান দুর্ঘটনার সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে সন্ধ্যায় গণমাধ্যমকে ব্রিফ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি। কাঠমান্ডুর বাংলাদেশ দূতাবাসের বরাতে প্রতিমন্ত্রী জানান, তারা যে তথ্য পেয়েছেন তাতে পাইলট, কো-পাইলট, কেবিন ক্রুসহ ৭১ আরোহীর মধ্যে ৪১ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ১০ জন নিখোঁজ রয়েছেন। বাকি ২০ জনের মধ্যে চার জন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। ১৬ জন গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে রয়েছে। ঘটনার পর এখন সরকার কি করছে জানাতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, জরুরি চিকিৎসা সেবা নিয়ে নেপালে যেতে প্রস্তুত রয়েছে বাংলাদেশ বিমান। সেখানে ডাক্তার, মেডিসিন, নার্স যাবে। নেপালের রানওয়ে বন্ধ রয়েছে, এটি চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিমানটি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছেড়ে যাবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র আরো জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পর নেপালের প্রধানমন্ত্রী খাগড়া প্রসাদ শর্মা ওলি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করেন। সিঙ্গাপুর সফররত প্রধানমন্ত্রী হাসিনা সে সময় একটি বৈঠকে থাকায় ফোন ধরতে পারেন নি। পরে অবশ্য দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে কথা হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ওদিকে ইউএস বাংলা সূত্র জানিয়েছে, বিধ্বস্ত ফ্লাইটের ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতান জীবিত উদ্ধার হয়েছেন। নেপালের পুলিশ বিবিসিকে জানিয়েছে, ৩১ জন ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছেন। আরো ৯ জন পরে হাসাপাতালে মারা গেছেন। তবে, নিহতদের কতজন কোন দেশের সেটা এখনো জানা যায়নি।
নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অপেক্ষমাণ বাংলাদেশি একজন যাত্রী জানিয়েছেন, বিমানটি রানওয়েতে নামতে গিয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পর বিবিসিকে তিনি বলেন, অবতরণ করার সঙ্গে সঙ্গেই বিমানটি কাঁপছিল। তারপরই তিনি দেখতে পান, হঠাৎ একসময় তাতে আগুন ধরে যায়। প্রত্যক্ষদর্শী বাংলাদেশি ছাত্র আশীষ কুমার সরকার বলেন, তিনি বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছিলেন বাংলাদেশে ফেরার জন্যে। ইউএস বাংলার ওই বিমানে করেই তার ঢাকায় ফেরার কথা ছিল।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের মোট আটটি বিমান আছে। এর মধ্যে চারটি ড্যাস এইট, চারটি বোয়িং। এর মধ্যে একটি ড্যাস এইট নষ্ট থাকার কারণে কিছুদিন যাবৎ হ্যাঙ্গারে পড়ে আছে। দেশের বিভিন্ন গন্তব্য ছাড়াও কলকাতা, কাঠমান্ডু, ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর, দোহা এবং মাসকট রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করে ইউএস বাংলা। এ ছাড়া এপ্রিলে চীনের গুয়াংঝু শহরে ফ্লাইট পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। চলতি বছরে আরো কয়েকটি বোয়িং বিমান বহরে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে ইউএস বাংলার। মানবজমিন

আপনার মতামত প্রদান করুন

টি মন্তব্য

Insurance Loans Mortgage

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by:

.