বুধবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ৩০ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
লন্ডন প্রবাসী, মাওলানা ফখরুল ইসলাম ট্রাস্টের বৃত্তি পরীক্ষা আগামীকাল  » «   জকিগঞ্জ কানাইঘাট আসনে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করলেন ইকবাল আহমদ  » «   সিলেট-৫ আসনে বিএনপির মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করলেন জাহিদুর রহমান  » «   জকিগঞ্জ কানাইঘাট আসনে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন মামুনুর রশীদ  » «   বারহাল ছাত্র পরিষদের এক দশক পূর্তীতে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় কর্মসূচী আগামীকাল  » «   শাব্বির আহমদের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ  » «   মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন আমেরিকা প্রবাসী শরীফ লস্কর  » «   জকিগঞ্জ কানাইঘাট আসনে ঐক্যফ্রন্টের মনোনয়ন ফরম জমা দেন শরীফ  » «   সিলেট-৫ থেকে বিএনপির মনোনয়ন ফরম কিনলেন পাপলু  » «   জকিগঞ্জ প্রেসক্লাব নেতৃবৃন্দের সাথে অ্যাডিশনাল এসপি এবং ওসির মতবিনিময়  » «  

তারুণ্যের কবি নজরুল

আ ফ তা ব চৌ ধু রী ; নজরুল বুঝতে পারলেন যে, এসব প্রাচীর ভাঙতে পারে একমাত্র তরুণরাই; কারণ তাদের কোনো ধর্ম নেই, তাদের একটি মাত্র ধর্মÑ তারা তরুণ। এ কথা তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন একটি বক্তৃতায়। তারুণ্যকে কোন দৃষ্টিতে দেখতেন নজরুল, তা তার একটি বক্তব্যে স্পষ্ট। তিনি একটি অভিভাষণে বলেছিলেন, তরুণ তারুণ্যের মতোই, যে তারুণ্য তিমিরবিদারী, সে যে আলোর দেবতা। তার একটি বিখ্যাত গানে আছে
কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে সিরাজগঞ্জে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলিম তরুণ সম্মেলনের সভাপতির ভাষণে বলেছিলেনÑ ‘আমরা যৌবনের পূজারি, নব নব সম্ভাবনার অগ্রদূত, নব-নবীনের নিশানবর্দার। আমরা বিশ্বের সর্বাগ্রে চলমান জাতির সহিত পা মিলাইয়া চলিব। ইহার প্রতিবন্ধক হইয়া দাঁড়াইবে যে, বিরোধ আমাদের শুধু তাহার সঙ্গেই। ঝঞ্ঝার নূপুর পরিয়া নৃত্যায়নমান তুফানের মতো আমরা বহিয়া যাইব। যাহা থাকিবার তাহা থাকিবে, যাহা ভাঙ্গিবার তাহা আমাদের চরণাঘাতে ভাঙ্গিয়া পড়িবেই। দুর্যোগ রাতের নিরন্দ্র অন্ধকার ভেদ করিয়া বিচ্ছুরিত হউক আমাদের প্রাণপ্রদীপ্তি। সকল বাধানিষেধের শিখর-দেশে স্থাপিত আমাদের উদ্ধত বিজয় পতাকা। প্রাণের প্রাচুর্যে আমরা যেন সকল সংকীর্ণতাকে পায়ে দলিয়া চলিয়া যাইতে পারি।’
তারুণ্যের কবি হিসেবে তার আদর্শ কী, এ অভিভাষণে তা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। ওই অভিভাষণে তিনি আরও বলেছিলেন, ‘তারুণ্যকে, যৌবনকে আমি যেদিন হতে গান গাহিতে শিখিয়াছি, সেইদিন হইতে বারে বারে সালাম করিয়াছি, তাজিম করিয়াছি, সশ্রদ্ধ নমস্কার নিবেদন করিয়াছি।’ সত্যিই নজরুলের কাব্যে, গানে, এমনকি গল্পে এবং নাটকেও তারুণ্য উপচে পড়ছে। বলতে কি, নজরুল নিজেই ছিলেন তারুণ্যের এক জীবন্ত প্রতীক। বাধা-বন্ধনহারা জাত বোহেমিয়ানÑ গানে আর হাসি উল্লাসে ফেটে পড়া প্রাণ, অকুতোভয়ে প্রচলিত ভাঙনশীল সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। অত্যাচারী শোষক ও শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা, আবার অন্যদিকে সামান্য প্রাণের স্পর্শ পেলে সেটুকুর জন্য সর্বস্বত্যাগ তারুণ্যের এ পরিচয় আমরা পাই নজরুলের পুরো জীবনে।
বাংলা সাহিত্যে সর্বপ্রথম মারমুখী কবিতা লিখেছেন কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলা কাব্যের পৌরুষ জেগে উঠেছে তার কবিতায় :
বল বীরÑ
বল উন্নত মম শির
শির নেহারি আমারি নতশির ওই শিখর
হিমাদ্রির।
অথবা
ওরে আয়,
ওই মহাসিন্ধুর পার হতে ঘন
রণভেরী শোনা যায়।
এসব কবিতা যখন প্রকাশিত হতে শুরু করে একের পর এক, যদিও অখ্যাত লিটলম্যাগে, তখন বাংলার তরুণসমাজের রক্তে যেন আগুন ধরে গিয়েছিল। অসংখ্য লেখক এ স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। নজরুল যে যুগে কবিতা লিখতে শুরু করেন, তখন দেশের ভেতর দু-ধরনের স্বাধীনতা আন্দোলন চলছেÑ গান্ধীজির অহিংস সত্যাগ্রহ আর বিপ্লবী তরুণদের সহিংস সন্ত্রাস। হাবিলদার কবি কাজী নজরুল ইসলাম সমর্থন জানালেন সন্ত্রাসবাদকেই; কারণ এতে ছিল তারুণ্যের উচ্ছলতা-জীবনদীপ্তি। তিনি লিখলেন :
গান্ধীজির দল কাটছে চরখা,
আমরা কাটব মাথা।
তিনি তীব্র রোষে লিখলেন :
দক্ষিণ করে ছিড়িয়া শিকল বাম করে বাণ হানি
এস নিরস্ত্র বন্দির দেশে হে যুগ শস্ত্রপাণি।
…….
জাগোরে জোয়ান, বাত ধরে গেল মিথ্যার তাঁত বুনি।
এ পঙ্ক্তিটিতে ক্ষোভের প্রকাশ স্পষ্টতই গান্ধীজির চরখানীতির বিরুদ্ধে। তাই বলে নজরুল গান্ধীর জন্য অন্তরে শ্রদ্ধা-সম্মান পোষণ করতেন না এরকম নয়। নেতাজি সুভাষের মতোই তিনিও সসম্মানেই গান্ধীজির পথ পরিত্যাগ করেছিলেন, অথচ একদিন নজরুল ‘চরখার গান’ শুধু রচনাই করেননি, গেয়ে গান্ধীজিকে তুষ্টও করেছিলেন।
যা হোক, নজরুলের এসব অগ্নিঝরা কবিতা কীভাবে দেশের যুবকদের মধ্যে প্রাণোন্মাদনা জাগিয়েছিল, তার একটি প্রমাণ এই যে, আন্দামানে ফাঁসির সময় একজন বিপ্লবী যুবক গেয়ে উঠেছিলেন :
মোরা ফাঁসী পরে আনব হাসি
মৃত্যুজয়ের ফল,
মোদের অস্থি দিয়ে জ্বলবে দেশে আবার বজ্রানল।
দেশে সে সময় নানা বিভেদের প্রাচীর মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে মানুষের মাঝখানে। নজরুল বুঝতে পারলেন যে, এসব প্রাচীর ভাঙতে পারে একমাত্র তরুণরাই; কারণ তাদের কোনো ধর্ম নেই, তাদের একটি মাত্র ধর্মÑ তারা তরুণ। এ কথা তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন একটি বক্তৃতায়।
তারুণ্যকে কোন দৃষ্টিতে দেখতেন নজরুল, তা তার একটি বক্তব্যে স্পষ্ট। তিনি একটি অভিভাষণে বলেছিলেন, তরুণ তারুণ্যের মতোই, যে তারুণ্য তিমিরবিদারী, সে যে আলোর দেবতা। তার একটি বিখ্যাত গানে আছে :
নব নবীনের গাহিয়া গান
সবুজ করিব মহাশ্মশান,
আমরা দানিব নূতন প্রাণ,
বাহুতে নবীন বল।
অর্থাৎ বিভেদ, অন্যায়, অসত্য, অত্যাচারের তিমিরবিদারী যে তারুণ্য, মানবতার মহাশ্মশানকে যে তারুণ্য সবুজ ও প্রাণবন্ত করতে পারে, বুকে নতুন প্রাণ এবং বাহুতে নবীন বল যে সঞ্চার করে, সে তারুণ্যেরই বিজয়গীতির গায়ক কবি। নব নব সৃষ্টি ও আবিষ্কারের জন্য যে তারুণ্য পাগল, নজরুল সে তারুণ্যের বৈতালিক। তিনি লিখেছেন :
আমি গাই তারি গান
দৃপ্ত হস্তে যে যৌবন আজ ধরে আসি
খরসান।
গুঞ্জরি ফেরে ক্রন্দন মোর তাদের নিখিল ব্যেপে
ফাঁসির রজ্জু ক্লান্ত আজিকে তাহাদের টুঁটি চেপে।

সেদিন নিশীথ বেলা
দুস্তর পারাবারে যে যাত্রী একাকী ভাসাল ভেলা,

প্রভাতে সে আর ফিরিল না কূলে।
সেই দুরন্ত লাগি
আঁখি মুছি আর রচি গান আমি

আজিও নিশীথে জাগি।
… সাগরগর্ভে নিঃসীম নভে দিক দিগন্ত জুড়ে
জীবনোদ্বেগে তাড়া করি ফেরে নিতি যারা মৃত্যুরেÑ
সে তরুণের সেই তারুণ্যের কবি নজরুল। এ তারুণ্যকে তিনি বলেছেন ‘যৌবন জলতরঙ্গ’। প্রশ্ন করেছেন :
এ যৌবন জলতরঙ্গ রুধিবে কি দিয়া বালির বাঁধ?
নজরুলের নাটকেও যৌবনেরি গান :
যৌবন নটিনী ছুটে চলে ছলছল
ধরণীর তরণী টলমল টলমল।
তার স্বর্গ কল্পনায়ও যৌবনই যৌবন:
যুবক-যুবতীর সে দেশে ভিড়,
সেথা যেতে নারে বুঢণা পীর,
শাস্ত্র শকুন জ্ঞান মজুর
যেতে পারে সেই হুরীপরীর
শারাবসাকীর গুলিস্তাঁয়
আয় বেহেশতে কে যাবি আয়।
সিরাগঞ্জের অভিভাষণে নজরুল বলেছিলেন, ‘যৌবন দেখিয়াছি তাহাদের মাঝেÑ যাহারা বৈমানিক রূপে অনন্ত আকাশের সীমা খুঁজতে গিয়া প্রাণ হারায়, আবিষ্কারকরূপে নবপৃথিবীর সন্ধানে গিয়ে আর ফিরে না, … যৌবন দেখিয়াছি সেই দুরন্তদের মাঝে। যৌবনের মাতৃরূপ দেখিয়াছিÑ শব বহন করিয়া যখন যে যায় শ্মশানঘাটে, গোরস্তানে, অনাহারে থাকিয়া যখন সে অন্ন পরিবেশন করে দুর্ভিক্ষ বন্যাপীড়িতদের মুখে, বন্ধুহীন রোগীর শয্যাপার্শ্বে যখন রাত্রির পর রাত্রি জাগিয়া পরচর্যা করে, যখন যে পথে পথে গান গাহিয়া ভিখারি সাজিয়া দুর্দশাগ্রস্তদের জন্য ভিক্ষা করে, যখন সে দুর্বলের পাশে বল হইয়া দাঁড়ায়, হতাশের বুকে আশা জাগায়।’
নজরুল লক্ষ করেছিলেন যে যৌবন তার এ ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছে, বৃদ্ধ চতুর রাজনীতিবিদরা তরুণদের চোখে লোভের অঞ্জন পরিয়ে দিচ্ছে, তখন বড় দুঃখে ও অভিমানে ‘শিখা’ কবিতায় লিখলেন (১৯৩৯) :
হায়রে ভারত, হায়, যৌবন তাহার
দাসত্ব করিতেছে অতীত জরার
জরাগ্রস্ত বুদ্ধিজীবী বৃদ্ধ জরদগাবে
দেখায়ে গলিত মাংস চাকরির মোহ
আনিয়াছে একেবারে ভাগাড়ে শ্মশানে।
যে হাতে পাইত শোভা খরতরবারি
সেই তরুণের হাতে ভোট ভিক্ষাঝুলি
বাঁধিয়া দিয়াছে হায়, রাজনীতি ইহা।
তারুণ্যের কবি নজরুল এ দৃশ্য সহ্য করতে পারলেন না। তাই লজ্জায় দু-হাতে শয়ন ঢেকে তিনি পলায়ন করলেন :
এই দৃশ্য দেখিবার আগে কেন মৃত্যু হইল না।
১৯৪০ সালে কলকাতা মুসলিম ইনস্টিটিউট ছাত্র সম্মেলনীর অধিবেশনে কবি তরুণ শক্তিকে আহ্বান করেছিলেন ‘কাবুলি সুদখোরের চেয়েও আরও জঘন্য বৃদ্ধ জঈফ, দুষ্টবুদ্ধিসম্পন্ন’ সেসব নেতাদের কবলমুক্ত হতেÑ যাদের ‘যৌবন নাই, কিন্তু যৌবনের কাঁধে ভর করে জয়যাত্রার মিছিল বের করার প্রখর বুদ্ধি আছে।’ তিনি বলেছিলেন তরুণরা যদি তাদের দায়িত্ব বুঝতে পারে, তাহলে এ জরায় মরা কূটবুদ্ধি নেতাদের কবলমুক্ত করা হবে এবং তখনই তাদের মধ্যে আবির্ভূত হবেন চিরসত্য, চিরসুন্দর সৃষ্টিকর্তা। তিনি বারে বারে বলেছেন, এ তার বিশ্বাস, এ তার দিব্যদৃষ্টি।
নজরুলের এ বাণীই প্রমাণ করে, তিনি তারুণ্যকে কতটুকু শ্রদ্ধা করতেন, তারুণ্যকে কত মহান ও পবিত্র মনে করতেন, তারুণ্যের ওপর তার কী প্রগাঢ় বিশ্বাস ছিল। বাংলা সাহিত্যের সমগ্র ইতিহাসে নজরুলের মতো তারুণ্যের কবি আর দ্বিতীয়জন নেই।

আপনার মতামত প্রদান করুন

টি মন্তব্য

Insurance Loans Mortgage

Developed by:

.