মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ২৯ কার্তিক ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
জকিগঞ্জ কানাইঘাট আসনে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন মামুনুর রশীদ  » «   বারহাল ছাত্র পরিষদের এক দশক পূর্তীতে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় কর্মসূচী আগামীকাল  » «   শাব্বির আহমদের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ  » «   মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন আমেরিকা প্রবাসী শরীফ লস্কর  » «   জকিগঞ্জ কানাইঘাট আসনে ঐক্যফ্রন্টের মনোনয়ন ফরম জমা দেন শরীফ  » «   সিলেট-৫ থেকে বিএনপির মনোনয়ন ফরম কিনলেন পাপলু  » «   জকিগঞ্জ প্রেসক্লাব নেতৃবৃন্দের সাথে অ্যাডিশনাল এসপি এবং ওসির মতবিনিময়  » «   জকিগঞ্জে জাতীয় সমবায় দিবস উদযাপন উপলক্ষে প্রস্তুতি সভা  » «   আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন হাফিজ মজুমদার  » «   জকিগঞ্জের হানিগ্রাম প্রবাসী ঐক্য পরিষদের কমিটি গঠন  » «  

তাকওয়া অর্জনে রোজার ভূমিকা

সৈয়্যেদ নূরে আখতার হোসাইন আহমদীনূরী ;  মোমিনের চরিত্র গঠনে রোজার ভূমিকা অপরিসীম। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সূরা বাকারায় সিয়াম সাধনাকে একটি প্রশিক্ষণ বলেছেন, যার মাধ্যমে মুত্তাকি হওয়া যায়। শরিয়তের ভাষায় সব পাপাচার, অনাচার, অবিচার, অত্যাচার এবং এ জাতীয় কাজ থেকে বিরত থেকে কোরআন ও হাদিস অনুসারে জীবন পরিচালনার নাম ‘তাকওয়া’। আর যিনি এসব কাজ পরিহার করে চলেন, তাকে ‘মুত্তাকি’ বলা হয়।

রুহানি উন্নতি এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের ক্ষেত্রে রোজার অবদান সবচেয়ে বেশি। রোজার শিক্ষা হলো আত্মসংযম, আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মশুদ্ধিতা, ধৈর্য, তাকওয়া, ত্যাগ স্বীকার, ভ্রাতৃত্ব বোধসহ অসংখ্য সদগুণ সৃষ্টি করা। একই সঙ্গে সব ধরনের পাপ কাজ, মিথ্যা কথা, ঘুষ খাওয়া, চুরি করা ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা। অন্য সব ইবাদতের মধ্যে রোজার মর্যাদা সর্বাধিক। আত্মিক, বাহ্যিক, ইহলৌকিক, পারলৌকিক বহুবিধ কল্যাণে রোজা পরিপূর্ণ। বলা হয়েছেÑ রোজা অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঢালস্বরূপ। কারণ রোজা এমন একটি আমল, যাতে লোক দেখানোর সুযোগ নেই। এটি বান্দা ও আল্লাহর মধ্যকার একটি অতিগোপন সম্পর্ক। নামাজ, জাকাত, হজসহ অন্যান্য ইবাদত পালন করলে তা দেখা যায়, পরিত্যাগ করলেও বোঝা যায়। এসব ইবাদতে রিয়া জন্মানোর আশঙ্কা থাকে; কিন্তু রোজার মধ্যে এখলাস বা আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও একনিষ্ঠতা নির্ভেজাল ও বেশি থাকে। হাদিস শরিফে আছেÑ রোজাদারের নিদ্রাও ইবাদততুল্য এবং শ্বাসপ্রশ্বাস তসবিহ পাঠসদৃশ এবং দোয়া কবুলযোগ্য। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহর ঘোষণাÑ রোজাদারের মুখের গন্ধ আমার কাছে মৃগনাভির সুগন্ধের চেয়েও প্রিয়। রোজা সম্পর্কে আল্লাহ পাক আরও বলেছেন, রোজা আমার উদ্দেশ্যে রাখা হয় এবং আমি এর প্রতিদান দেব।
হজরত ইমাম গাজ্জালি (রহ.) মর্যাদা হিসেবে রোজাকে তিন শ্রেণিতে ভাগ করেছেনÑ এক. নিম্নশ্রেণির রোজাÑ শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকা। নানাবিধ গোনাহের কাজ থেকে বিরত থাকার চিন্তা থাকে না। দুই. মধ্যম শ্রেণির রোজাÑ পানাহার প্রভৃতি থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি সব পাপ থেকে আত্মরক্ষা করা; যেমনÑ মুখ ও জিহবাকে সংযত রাখা, অনর্থক কথা বলা, মিথ্যা, গীবত প্রভৃতি থেকে বিরত থাকা, চক্ষুকে হারাম দর্শন থেকে সংযত রাখা। এরূপ রোজা শতগুণে প্রশংসনীয়। তিন. উচ্চশ্রেণির রোজাÑ এ শ্রেণির রোজায় পানাহার প্রভৃতি থেকে বিরত থাকার সঙ্গে সঙ্গে অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে পাপকাজ থেকে বিরত রাখা হয়; অপরদিকে মনকেও কুপ্রভাব, কুচিন্তা থেকে পবিত্র রাখা এবং আল্লাহর ধ্যান ও ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে রোজাকে সমৃদ্ধ করা হয়। এটিই রোজার প্রকৃত হকিকত।
আল্লাহর প্রেমিকরাই রোজার হকিকত সম্যক উপলব্ধি করতে পারেন এবং সে অনুযায়ী আমল করে থাকেন। রোজার মাধ্যমে তারা নফসে আম্মারাকে ধ্বংস করে থাকেন। দৈহিক ভোগবিলাসের যে তীব্র আকাক্সক্ষা মানবহৃদয়ে জাগ্রত হয়, তা-ই নফসে আম্মারা বা ভোগাত্মা। এর কাজ মানবাত্মাকে বিভ্রান্ত করা এবং আত্মিক বা আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে অন্তরায় সৃষ্টি করা। অথচ জাগতিক লোভলালসা, কামনাবাসনা থেকে মোহমুক্ত না হতে পারলে মহাপ্রভুর সান্নিধ্য লাভ করা সম্ভব নয়। আল্লাহ পাক পবিত্র কোরআনে বলেছেন, নিশ্চয়ই নফসে আম্মারা মানুষকে বিপথগামী করে। তাই মাওলানা রুমি বলেছেন, নফসে আম্মারা ফেরাউনের চেয়েও কম শক্তিশালী নয়। এ অর্থেই রাসুল (সা.) বলেছেন, প্রতিটি মানবসন্তানের সঙ্গেই একটি একটি করে শয়তান রয়েছে।
রোজার হকিকত নফসের কামনাকে সংযত রাখা এবং নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা। মানুষের দশ ইন্দ্রিয় যেমন সৎকাজে, তেমনই পাপ কাজের জন্য সমান উপযোগী। এসব ইন্দ্রিয় দ্বারাই মানুষ আল্লাহর ফরমাবরদারি করে, আবার নাফরমানিও করে। তাই সব ইন্দ্রিয়কে স্ববশে রাখার জন্য রোজা সবচেয়ে মোক্ষম হাতিয়ার। এরূপ রোজার প্রকৃষ্ট নিদর্শন পাওয়া যায় মহান সুফি সাধক ও আল্লাহর অলিদের জীবনে। হজরত বড়পীর মহিউদ্দিন আবদুল কাদির জিলানি (রহ.) বলেছেন, পানাহার এবং যা কিছু করলে রোজা ভঙ্গ হয়, তা করা থেকে বিরত থাকা শরিয়তের বিধানমতে রোজা। অপরপক্ষে হারাম, কুপ্রবৃত্তি, লোভলালসা ও নিষেধ সব কাজ থেকে বিরত থাকাই তরিকতের রোজা। নিষেধ কাজে তরিকতের রোজা নষ্ট হয়ে যায়। শরিয়তের রোজা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কিন্তু তরিকতের রোজা আজীবন, সারাক্ষণ।
তাই রমজান মাসের রোজা ছাড়াও রাসুল (সা.) এবং তার অনুসরণে সাহাবায়ে কেরাম অনেক রোজা পালন করতেন। কোনো কোনো সময় রাসুল (সা.) একাদিক্রমে কয়েক রোজা পানাহার করতেন না। কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম তাঁর অনুসরণ করার ইচ্ছা করলে তিনি বলেন, তোমরা সওমে বিসাল (অর্থাৎ কোনো কিছু পানাহার না করে ক্রমাগত রোজা রাখা) থেকে বিরত থাক। সাহাবারা আরজ করেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি তো ক্রমাগত রোজা পালন করেন। তখন তিনি এরশাদ করেন, আমি তোমাদের মতো নই। আমি তোমাদের প্রভুর কাছে রাত অতিবাহিত করি। তিনি আমাকে পানাহার করান।
রোজার কারণে নফস দুর্বল হয়ে পড়ে। নফসের কামনাকে সংযত ও নিয়ন্ত্রণে রাখাই রোজার হকিকত। এর মধ্যে সব তরিকত লুক্কায়িত। হজরত জুনাইদ বোগদাদি (রহ.) বলেছেন, রোজা তরিকতের অর্ধাংশ। মানুষ তার ইন্দ্রিয় অর্থাৎ চোখ, কান, নাসিকা, জিহবা, ত্বক ইত্যাদি দ্বারা নেক ও পাপ কাজ করতে পারে। এ ইন্দ্রিয়গুলো আল্লাহর আনুগত্য ও নাফরমানির জন্য সমান উপযোগী। মানুষের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে সে নিজ ইন্দ্রিয়গুলো নিয়ন্ত্রণে রেখে তা ইলম, আকল ও রুহের মাধ্যমে ব্যবহারের চেষ্টা করবে কিংবা নফসের কামনা-বাসনার ওপর ছেড়ে দেবে। এগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য রোজা পালনের চেয়ে উত্তম কোনো উপায় নেই।
মহান সুফি সাধক হজরত মাহবুবে রব্বানী খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়া (রহ.) বলেছেন, রোজা আল্লাহ ও তাঁর বান্দার মধ্যে একটা রহস্য। যে ব্যক্তি রমজানের আগমনে সন্তুষ্ট হয়, আল্লাহ তাকে সারা বছর সন্তুষ্ট রাখেন এবং তার কর্মে বরকত দান করেন। আর যে ব্যক্তি রমজান মাসের বিদায়ে অন্তরে ব্যথা অনুভব করে, আল্লাহ তাকে ইহকাল ও পরকালে সৌভাগ্যবান করেন এবং সে কখনও দুঃখিত হবে না। তিনি আরও বলেন, রমজান মাস এক অত্যাশ্চর্য মাস। সারা মাসটিতে রয়েছে শুধু বরকত আর রহমত। রমজান ছাড়া বছরের এগারোটি মাসে যে পরিমাণ করুণা ও বরকত নাজিল হয়, সেই সমপরিমাণ বরকত নাজিল হয় রমজান মাসের প্রতিটি দিনে। রমজান মাসে রোজা পালন করলে সারা বছর ইবাদতের সওয়াব পাওয়া যায় এবং অগণিত পাপ আমলনামা থেকে মুছে যায়। তিনি বলেন, রমজানের শেষ দশ দিনের মধ্যে শবেকদর হয়। এ রাতের নেয়ামত সব রাতের মধ্যে একত্র।
মুসলিম সমাজ পবিত্র রমজান মাসে অধিক মাত্রায় ইবাদত-বন্দেগি ও দানখয়রাত করে এবং আন্তরিকভাবে রোজার ফজিলত অর্জনে সচেষ্ট থাকে। কিন্তু বিপরীত কিছু দৃশ্যও পরিলক্ষিত হয়, যা আমাদের মতো মুসলিম দেশের জন্য কাম্য নয়। রমজান মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম তুলনামূলক কম থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। ব্যবসায়ীদের এরূপ অতিমুনাফালোভী দৃষ্টিভঙ্গি ইসলামবিরুদ্ধ।
তাদের উচিত দুনিয়াদারির মোহ ত্যাগ করে আল্লাহর প্রেমে উৎসর্গিত হয়ে রোজার পরিপূর্ণ ফজিলত অর্জনে সচেষ্ট হওয়া। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সবাইকে তওফিক দান করুন।

আপনার মতামত প্রদান করুন

টি মন্তব্য

Insurance Loans Mortgage

Developed by:

.