মঙ্গলবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০১৭ খ্রীষ্টাব্দ | ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ

ঢাকা পাল্টে দিচ্ছিলেন তিনি….

স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন: সিটি নির্বাচন করার আগেই আনিসুল হক পেশাজীবীদের সঙ্গে বেশ কয়েকবার বৈঠক করেন। তাঁর মধ্যে স্থপতি ও পরিকল্পনাবিদরাও ছিলেন।

বৈঠকের কারণ হলো, যদি তিনি ঢাকার মেয়র হতে পারেন তাহলে নগরীর উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু করবেন কিভাবে সে বিষয়ে আমাদের পরামর্শ নেওয়া। আমরা তখন বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছিলাম। এর মধ্যে ছিল ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে ভূমিকা নেওয়া, আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ফুটপাত দখলমুক্ত করা, ভালো মানের টয়লেট স্থাপন করা, উন্মুক্ত স্থান বাড়ানোসহ বেশ কিছু পরিকল্পনা। তিনি নির্বাচনে জয় পাওয়ার পর মাত্র দুই বছর সময় পেয়েছেন। এই দুই বছরে আমাদের দেওয়া পরামর্শগুলো বাস্তবায়নে খুব চেষ্টা করেছেন। রাত-দিন খেটেছেন। মাত্র দুই বছর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড শেষ করার জন্য কোনো সময়ই নয়, তবুও তিনি অনেক করেছেন।

আমরা আনিসুল হককে বলেছিলাম ঢাকাতে অন্তত ৫০০ ভালো টয়লেট স্থাপন করেন। প্রায়ই তিনি দুঃখ করে বলতেন, টয়লেট স্থাপনের জন্য ঢাকায় জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না।

প্রথমে আনিসুল হক ভেবেছিলেন পেট্রলপাম্পগুলোতে টয়লেটের ব্যবস্থা করবেন। কিন্তু পাম্প মালিকরা নিরাপত্তার কারণে জায়গা দিতে রাজি হলেন না। আধুনিক যেসব টয়লেট তিনি স্থাপন করলেন সেখানে কিন্তু নারীর জন্য সুন্দর ব্যবস্থা ছিল, প্রতিবন্ধীর জন্যও আলাদা ব্যবস্থা ছিল। এ রকম টয়লেট কিন্তু অনেক উচ্চ মধ্যবিত্তের বাসাবাড়িতেও নেই।

ঢাকাকে সবুজ নগরী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন। তিনি ঢাকার ফুট ওভার ব্রিজে ফুলগাছ লাগানো শুরু করলেন। অনেক বড় কাজের পাশাপাশি এমন ছোট্ট ছোট্ট কাজের মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের আস্থা অর্জন করতে পেরেছিলেন।

সব থেকে বেশি তিনি অভিনন্দিত হন ঢাকার যানজট দূর করার লক্ষ্যে বাস্তব কিছু পদক্ষেপ হাতে নিয়ে। তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো এই কাজগুলো সম্পন্ন করা যেত। ঢাকায় কোনো যানজট থাকত না। ঢাকা থেকে যানজট নিরসনে তিনি ১৯টি ইউলুপ করার পরিকল্পনা নেন। এগুলোর কয়েকটির কাজ শুরু হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে, সড়কে নতুন বাস নামলে ঢাকা পাল্টে যাবে।

আনিসুল হক তেজগাঁও সাতরাস্তা থেকে ট্রাকস্ট্যান্ড তুলে দেন। এটি করতে গিয়ে অনেক বাধার সম্মুখিন হন। এর পরও তিনি ট্রাকস্ট্যান্ড তুলে দিয়ে সেখানে নতুন সড়ক নির্মাণ করেছেন। এখন সেটি একটা চমত্কার প্রশস্ত সড়ক। এরপর রয়েছে মোহাম্মদপুরের সাতমসজিদ থেকে বেড়িবাঁধ পর্যন্ত অবৈধ দখলে থাকা প্রায় এক কিলোমিটার জায়গা উদ্ধার। সেখানে একটি বাইপাস রাস্তা করে দেন আনিসুল হক। এ রাস্তা দিয়ে ধানমণ্ডিসহ পশ্চিম ও দক্ষিণ ঢাকার মানুষ সহজে গাবতলী পৌঁছে যেতে পারছে কোনো যানজট ছাড়াই। গাবতলী বাসস্ট্যান্ড অবৈধ দখল মুক্ত করেন তিনি। এটি অনেক বড় কাজ ছিল। প্রতিটি উচ্ছেদ কার্যক্রমের সঙ্গে পুনর্বাসন ছিল প্রথম কাজ। ফলে যারা উচ্ছেদ হয়েছে তাদের মনে ক্ষোভ ছিল না।

যানজট নিরসন করা যায় কিভাবে তা নিয়ে আনিসুল হক আমাদের সঙ্গে আলোচনা করলেন। বিশেষজ্ঞদের কর্মশালা করলেন। গোটা ঢাকা শহরে চার হাজার বাস নামানোর পরিকল্পনা নেন তিনি। এতে বাসমালিকদের সম্পৃক্ত করেন মেয়র। ছয়টি কম্পানি এই বাসগুলো পরিচালনা করবে। এতে স্বল্প সুদে যাতে ঋণ দেওয়া হয় সে জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে তিনি এ পরিকল্পনায় সম্পৃক্ত করেন।

আমাদের সন্তানদের আকাশ দেখার ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য আনিসুল হককে বলেছিলাম। তিনি অবৈধ বিলবোর্ড অপসারণ শুরু করেন।

ছোট থেকে ওপরে উঠে আসার প্রতিটি ক্ষেত্র যদি আমরা লক্ষ করি তাহলে তাঁকে একজন সফল মানুষ হিসেবে দেখব। সব শাখায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। টেলিভিশনে উপস্থাপনার কথা থেকে শুরু করে সফল উদ্যোক্তা হওয়া অথবা ব্যবসায়ী নেতা হিসেবে তিনি পুরো কমিউনিটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

একজন সফল মানুষের পেছনে পরিবারের ভূমিকা থাকতে হয়। আমি খুব কাছ থেকে আনিসুল হককে দেখেছি। স্ত্রী রুবানা হক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন আনিসুল হকের জীবনে। অনেক কাজে আমরা তাঁর স্ত্রী রুবানা হককে পাশে পেয়েছি।

উনি প্রায়ই একটা কথা বলতেন, পূতিগন্ধময় হাতিরঝিলকে যদি এমন দৃষ্টিনন্দন করা যায় তাহলে ঢাকা শহরকে কেন তিলোত্তমা করা যাবে না। কারণ ঢাকা শহরের চার পাশে নদী রয়েছে। ঢাকাকে আমরা পৃথিবীর সেরা সুন্দর শহর হিসেবে গড়ে তুলতে পারি। আমি বিশ্বাস করি, ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে কেউ না কেউ আনিসুল হকের স্বপ্ন পূরণ করবেন। নিশ্চয় এমন কাউকে পাওয়া যাবে যিনি আনিসুল হকের স্বপ্ন দেখার ও বাস্তবায়নের সাহস রাখেন।

অনুলিখন : আরিফুজ্জামান তুহিন

আপনার মতামত প্রদান করুন

টি মন্তব্য

Insurance Loans Mortgage

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by:

.