শুক্রবার, ২১ জুলাই, ২০১৭ খ্রীষ্টাব্দ | ৬ শ্রাবণ ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
জকিগঞ্জ প্রবাসী সমাজ কল্যাণ সংস্থার উপদেষ্টা পরিষদ  » «   সিলেট থেকে নিখোঁজ হওয়া শিক্ষা অফিসার রফিক বাসায় ফিরেছেন  » «   তামিমের সাথে এবার অপেনিং করবেন ইমরুল  » «   বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্র দল বারহাল ইউনিয়ন শাখার কমিটি গঠন সম্পন্ন  » «   বিরশ্রীতে সরকারি উন্নয়নমূলক কাজে বাঁধা দেয়ায় ফারুক আটক  » «   বন্যার্ত,অসহায় পরিবারের মাঝে *আনোয়ার ওয়েলফের ট্রাষ্ট*এর খাদ্য সামগ্রী বিতরন  » «   জকিগঞ্জের রফিক উদ্দিন এখনও উদ্ধার হননি  » «   জকিগঞ্জ বার্তায় সংবাদের পর সেই আহতকে আর্থিক সহযোগিতা ও চিকিৎসা প্রদান  » «   জকিগঞ্জে লন্ডন প্রবাসী আব্দুর রবের বাড়িতে চাল বিতরণে কামরান  » «   পুলিশ জনগণ মিলে চোর-ডাকাত রোধ করতে হবে, অ্যাডিশনাল এসপি মোস্তাক  » «  

ওষুধের চড়া দাম-জীবনের কম দাম

164151_138

খোন্দকার জিল্লুর রহমান: জীবন বাঁচাতে ওষুধ, জীবন সাজাতে প্রসাধনী, জীবনের সুখ, শান্তি, আনন্দ এবং নিজেকে সুন্দর করে দেখানোর জন্য প্রসাধনী। আর এত কিছুর জন্যই প্রয়োজন বেঁচে থাকা। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে বেঁচে থাকার জন্যই প্রয়োজন ওষুধ। যে ওষুধ বাঁচাবে জীবন, কিন্তু সেই ওষুধ কিনতে গিয়ে যদি ওষুধের চড়া দামই রোগীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তার সমাধান কে দেবে?
সম্প্রতি কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই মাসের পর মাস বছরের পর বছর দেশীয় বিভিন্ন ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান নিজেদের ইচ্ছায় খেয়াল খুশিমতো দাম বাড়িয়ে চলেছে। এতে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে এ বিষয়ে তদন্তকারী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের চোখে কোনো কিছুই পড়ে না। চলতি বছরই কয়েক দফায় বাড়ানো হয়েছে ছয়টি কোম্পানির প্রায় তিন শতাধিক ওষুধের দাম। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ থেকে শুরু করে প্রায় ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বাড়িয়েছে। এভাবে ওষুধের দাম বাড়তে থাকলে ওষুধ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে বলে সংশ্লিষ্ট ডাক্তার থেকে শুরু করে সমাজের বিশিষ্ট লোকের ধারণা।
অস্বাভাবিকভাবে ওষুধের দাম বাড়ালেও এ সংক্রান্ত সরকারের কোনো দফতরের মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। কর্তৃপক্ষকে বিশেষ ব্যবস্থায় ম্যানেজ করেই কোম্পানিগুলো অস্বাভাবিকভাবে কিছু দিন পরপরই ওষুধের দাম বাড়িয়ে চলেছে বলে অভিযোগ পাইকারি ওষুধ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে খুচরা ক্রেতা পর্যন্ত। তাদের মতে, দাম বাড়ানোর আগে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে কোম্পানিগুলো। এ কারণে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েই কোম্পানিগুলোর কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে বলে অনেকে মত প্রকাশ করেন।
বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, ব্যয়বহুল, সাশ্রয়ী বিপণন নীতি আর অধিক মুনাফার কারণেই স্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয় ওষুধের দাম। এ প্রসঙ্গে ওষুধশিল্প সমিতির মহাসচিব সফিউজ্জামান জানান, ওষুধের দাম বাড়ানোর সঠিক কোনো কারণ তার জানা নেই। তিনি আরো বলেন, ওষুদের দাম বাড়ানো সংক্রান্ত দুটি কমিটি রয়েছে। একটি টেকনিক্যাল প্রাইজ ফিক্সেশন কমিটি আর অন্যটি শুধু প্রাইজ ফিক্সেশন কমিটি। কোনো ওষুধের দাম কমাতে-বাড়াতে হলে এই কমিটির অনুমোদন প্রয়োজন হয়। তবে গত ৭-৮ মাসে এ কমিটিতে দাম বাড়ানো নিয়ে কোনো বৈঠক হয়েছে বলে আমার জানা নেই। ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের পরিচালক মো: রুহুল আমিনের মতে, কোনো ওষুধ সর্বোচ্চ খুচরা দাম পর্যায়ে বাড়ানো হলে, মূল্য নির্ধারণ কমিটি থেকে অনুমোদিত হয়ে থাকে। বর্তমানে কোনো ওষুধের দাম বেড়েছে কি না আমার জানা নেই। ওষুধের তালিকা দেখলে বলতে পারবেন বলে জানান তিনি।
ওষুধের পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, বেশ ক’দিন ধরেই বিভিন্ন ওষুধের দাম বাড়ছে। প্রথমে দু-একটি কোম্পানি দাম বাড়ায়, ঠিক সে অনুকরণে সব কোম্পানিই একই পদ্ধতি অনুসরণ করে। বিশেষ করে এই পদ্ধতি শুধু এ বছরই নয়, অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। গত বাজেটের মাসখানেক আগে থেকে বাড়ানো হয়েছে প্রায় শতাধিক ওষুধের দাম। সেই থেকে শুরু হয়েছে সব কোম্পানির দাম বাড়ানোর খেলা। ক’দিন পরই আবার ফয়েলের দাম বাড়ায় বাড়ানো হয়েছে শতাধিক ওষুধের দাম। গত বাজেটে (২০১৬-১৭) ফয়েলের দাম ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেন অর্থমন্ত্রী। আর মন্ত্রীর প্রস্তাবের পরপরই বাড়ানো হয় বেশ কিছু কোম্পানির ট্যাবলেট, ক্যাপসুলের দাম। এ যেন কোম্পানিগুলোর দাম বাড়ানোর মহোৎসব চলছে।
কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির তথ্য মতে, নোভার্টিস, ওরিয়ন, স্কয়ার, অপসোনিন, এসিআই, ইনসেপটাসহ বিভিন্ন কোম্পানি তাদের বেশ কিছু ওষুধের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। অতিরিক্ত বেড়েছে নিউরোপেথি ঠাণ্ডাজনিত রোগ, ঘুমের ওষুধ, গ্যাস্ট্রিক আলসার, ডায়াবেটিকস এবং ক্যালসিয়াম জাতীয় ওষুধের দাম। এসব ক্ষেত্রে বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় কোনো কোনো ওষুধ ১০ শতাংশ থেকে প্রায় ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। ফলে দেশের গরিব মানুষ থেকে সর্বস্তরের জনগণের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। যার প্রমাণ অহরহ পত্রপত্রিকাগুলোতে চিকিৎসার অভাবে মৃত্যু, চিকিৎসার জন্য সাহায্যের আবেদন, ওষুধের পয়সা জোগাতে না পেরে মৃত্যু দেখা যায়।
দাম বাড়ানোর প্রসঙ্গে কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সহসভাপতি আবদুল হাইয়ের মতে, দাম বাড়ানোর আগে কোম্পানিগুলো নির্দিষ্ট ওষুধের সরবরাহ কমিয়ে দেয়, পরে দাম বাড়িয়ে আবার সরবরাহ শুরু করে। আর একটি কোম্পানি বাড়ানোর পর প্রতিযোগিতা সবাই শুরু করে। তিনি বলেন, আগে দাম নির্ধারণ কমিটিতে তাদের রাখা হতো, এখন আর তাদের ডাকা হয় না। ফলে প্রশাসন ও কোম্পানির লোকেরা সমঝোতার মাধ্যমে মিলেমিশে ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছে। ওষুধ প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বেশ ক’দিন আগে কয়েকটি কোম্পানি ওষুধের দাম বাড়ানোর জন্য ওষুধ প্রশাসনে প্রস্তাব পাঠায়। ওই প্রস্তাব অনুযায়ী কোম্পানিগুলোর সাথে প্রশাসন বিশেষ ব্যবস্থায় ওষুধের দাম বাড়ানোর সুযোগ করে দেয়।
মানুষের জীবন, সামাজিক দায়বদ্ধতা নৈতিকতাবোধ এখন আর কোনো কাজে আসে না। এখন কোনো কোনো ওষুধের উৎপাদন খরচ বা কাঁচামাল আমদানি খরচ কমলেও কোম্পানিগুলো দাম না কমিয়ে উল্টো আরো বাড়িয়ে দেয়।
তবে ওষুধের দাম বাড়ানোর অন্যতম কারণ হিসেবে কোম্পানিগুলোর উচ্চাভিলাষী বিপণন নীতি ও অধিক মুনাফা করার মানসিক প্রবণতাকে দায়ী করেছেন বিএমএ’র সাবেক সভাপতি রশিদ-ই-মাহবুবসহ অনেকেই। কোম্পানিগুলো তাদের প্রতিনিধির মাধ্যমে চিকিৎসকদের জন্য বিপুল ব্যয় করে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গিফট, চেম্বার সাজিয়ে দেয়া ও আরো অনেক মূল্যবান গিফটের মাধ্যমে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে, তা আবার ওষুধের দাম বাড়িয়ে সমন্বয় করে থাকে। আবার সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা বিশেষ ব্যবস্থায় প্রাইজ ফিক্সেশন করে থাকে। এখানে কোনো সুশীলসমাজের প্রতিনিধিরা থাকেন না। অনেকের মতে, এসব ব্যাপারে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি তাদের দায় এড়িয়ে থাকেন বলে মনে করেন। সমাজ সচেতনতা, মানুষের বিবেক ও নৈতিকতা এখন আর কাজ করে না। তাই কবির ভাষায় সুর মিলিয়ে আমাকেও বলতে হয়- ‘হায়রে ভজনালয়, তোমার মিনারে চড়িয়া ভণ্ড গাহে স্বার্থের জয়।’

লেখক : রাজনীতিক

আপনার মতামত প্রদান করুন

টি মন্তব্য

Insurance Loans Mortgage

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by:

.