শনিবার, ২৬ মে, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
জকিগঞ্জে বৃহত্তর খলাছড়া প্রবাসী কল্যান সংস্থার আহবায়ক কমিটির আত্মপ্রকাশ  » «   জকিগঞ্জ বিদ্যুতের অভিযোগ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ  » «   পাঠানচক প্রবাসী জনকল্যাণ সংস্থার কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা ও দরিদ্রদের মধ্যে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ অনুষ্ঠান শনিবার  » «   প্রতিবন্ধী ও দরিদ্রদের মধ্যে জকিগঞ্জ এইচটিএ সেবা ফাউন্ডেশনের চাল বিতরণ  » «   সিলেট তিব্বিয়া কলেজের প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর, জকিগঞ্জের সন্তান আব্দুর রবের ইন্তেকাল  » «   দূর্ঘটনায় নিহত জকিগঞ্জের সালমান আহমদ সুমনের দাফন  » «   দরিদ্র, প্রতিবন্ধীদের নিয়ে জকিগঞ্জ এইচটিএ সেবা ফাউন্ডশনের ইফতার  » «   বারহাল ছাত্র পরিষদের উদ্যোগে কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা অনুষ্ঠান সম্পন্ন  » «   জকিগঞ্জে ফার্মাসিউটিকেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ এসো: কমিটি গঠন  » «   বাসের ধাক্কায় জকিগঞ্জের সুমনের মর্মান্তিক মৃত্যু  » «  

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস-বন্ধ হোক শ্রম শোষণ

মুফতি আহমদ আবদুল্লাহ:  প্রতিটি ভালো নিরবচ্ছিন্ন ভালো নয়। এর সঙ্গে কিছু মন্দও থাকে। অর্থনীতির বাছ-বিচারে শ্রমবিভাগ জরুরি। আপাতদৃষ্টিতে তা মানুষের বিভাজন ও শ্রেণিবৈষম্য সৃষ্টিকারী হলেও সমাজ ও রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ও কল্যাণ সাধনের জন্য শ্রমবিভাগ আবশ্যক। অবশ্য সমাজপতি ও রাষ্ট্রযন্ত্রের পরিচালকদের দ্বারা সাধারণ মানুষের নির্যাতিত হওয়ার ঘটনা ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। আমরা সভ্যতা বিকাশের এক পর্যায়ে এসে দেখতে পাই, গরু-ছাগলের বেচাকেনার হাটের মতো আদম সন্তানের বেচাকেনার হাট বসত। এক মানুষ আরেক মানুষের একচ্ছত্র মালিকানা লাভ করত সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বীকৃতি ও সহযোগিতায়। গৃহপালিত পশুর কাজের সময় নির্ধারিত থাকলেও গৃহভৃত্য মানুষের কোনো কাজের সময় নির্ধারিত ছিল না। নারী হলে তো কথাই নেই। তাদের একই সঙ্গে মনিবের সেবা ও মনোরঞ্জন করতে হত তার ইচ্ছা অনুযায়ী। শোষণ-নির্যাতনের এই মাত্রা শুধু মনিবের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকত না। তা তার আত্মীয়দের ভেতরও বিস্তার লাভ করত। ক্রীতদাস-দাসীদের সময়ের বিচারে দিন-রাত আর জীবনের বিচারে আমৃত্যু প্রস্তুত থাকতে হতো মালিকের সেবা, মনোরঞ্জনের জন্য। খাদ্য, তা পেত এতটুকু যা না হলে বেঁচে থাকা যায় না। বেঁচে থাকার মতো খাদ্য দেওয়া হলেও মান-বিচারে তা ছিল গৃহপালিত কুকুর-বিড়ালের মতো।
কৃষিকাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের অবস্থাও ঠিক একই রূপ। কৃষিকাজ এমনেতেই শ্রমনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা। এতে প্রচুর শ্রম বিনিয়োগ করতে হয়। খোলা আকাশের নিচে বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে পুড়ে কৃষি শ্রমিকদের কাজ করতে হয়। শুধু দিনে নয়, রাতেও তাদের অমানুষিক শ্রম ব্যয় করতে হয়। সুতরাং কৃষিকাজে নির্ধারিত কোনো সময় নেই। কাজের নির্ধারিত সময় না থাকলেও মজুরি সবসময় নির্ধারিত। তাও কোনোরকম বেঁচে থাকার মতো। প্রকৃতির দয়ামায়ার ওপর কৃষিকর্ম নির্ভরশীল থাকায় বছরের সবসময় কৃষি কাজ চলত না। তার ওপর কোনো সময় বন্যা বা খরা দেখা দিত, তখন এই অবস্থা আরও প্রকট আকার ধারণ করত। মজুরির হার আরও নিচে নেমে যেত। হাজার হাজার কৃষি শ্রমিক কাজের অভাবে, খাদ্যের অভাবে উপোস থেকে অপুষ্টিতে ভুগে মারা যেত। মহামারি দেখা দিত। কৃষিকাজ সরাসরি কৃষি শ্রমিকদের হাতে না থাকায় তারা সবসময় ভূস্বামীদের হাতে বন্দি ছিল। ছিল তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার দাস। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কৃষি- শ্রমিকের অবস্থা কৃতদাসের মতো ছিল।
এরপর এলো শিল্প বিকাশের যুগ। মানুষ ও পশুশক্তির বদলে যন্ত্রশক্তির ব্যবহার শিখল। উৎপাদনের প্যাটার্ন পাল্টে গেল। ভোগের সামগ্রীর বিস্তৃতি ঘটল। যন্ত্র ব্যবহার করে একসঙ্গে অনেক পণ্য উৎপাদিত হতে শুরু হলো। নতুন নতুন যন্ত্র ও উৎপাদন কৌশল আবিষ্কারের মানুষের শ্রমের মূল্য হ্রাস পেল। এই শিল্পবিপ্লবের ফলে উৎপাদন ও ভোগের মাত্রাতিরিক্ত উন্নতি হলেও শ্রমজীবী মেশিনম্যান তথা সাধারণ শ্রমিকদের অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। কাজের সময়সীমাও অনির্ধারিত রয়ে গেল। উদয়-অস্ত মেশিন চালিয়ে কাজ করেও রেহাই পেত না তারা। এই অমানুষিক পরিশ্রমের ফলে যক্ষ্মাসহ বিভিন্ন অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত হয়ে নিঃশেষ হয়ে গেলেও নিষ্কৃতি ছিল না। মজুরির হারও ছিল আগের মতো, কোনোরকম বেঁচে থাকা। এভাবে চলতে লাগল নতুন ধারায় নতুন কৌশলে শ্রম শোষণ। এক সময় শ্রমিক ভাইয়েরা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৮৮৬ সালের পহেলা মে গুলি হলো শান্তিপূর্ণ মিছিলে। মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন অনেক শ্রমিক। শ্রমিকদের এই মহান আত্মত্যাগের কারণে পহেলা মে’কে স্মরণীয় রাখার জন্য পরে এই দিনটাকে আন্তর্জাতিক শ্রমদিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে বিশ্বে প্রতি বছর পালিত হচ্ছে দিবসটি।
সফল শিল্পবিপ্লবের পর সভ্যতা এখন স্যাটেলাইট ও তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এসে উপনীত হয়েছে। রিমোট কম্পিউটার দ্বারা এখন সব কিছু নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। বিশ্ব আজ দু-ভাগে বিভক্ত। যারা শিল্পবিপ্লবকে সফলভাবে কাজে লাগাতে পেরেছে, তারা উন্নত বিশ্ব হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। আর যারা তা পারেনি তারা অনুন্নত দেশ নামে অভিহিত। এত কিছুর পরও শ্রম শোষণ বন্ধ হয়নি। গরিব দেশগুলো আগের মতোই রয়েছে। তবে উন্নত দেশগুলো এখন আর আগের মতো শ্রম শোষণ করতে পারে না। তাই তারা গরিব রাষ্ট্র থেকে শ্রমিক নিয়ে নতুন করে শোষণ চালাতে থাকে। কেমন যেন দাসপ্রথার মতো শ্রমিক আমদানি-রপ্তানি হচ্ছে। জুলুম ও নির্যাতন তো আছেই। অনেক সময় তাদের কাজের সময়ও থাকে অনির্ধারিত।
শুধু যে মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমিকরা শোষিত হচ্ছে, তা নয়। ওভারটাইম এবং প্রতারণার মাধ্যমেও তারা শোষিত হচ্ছে। মানুষ কোনো মেশিন নয়। মেশিনও অত্যধিক ব্যবহারে গরম হয়, ক্ষয় হয় অবশেষে অচল হয়ে পড়ে। ওভারটাইমের লোভ দেখিয়ে একজন শ্রমিককে দিয়ে নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত সময় কাজ করিয়ে অল্পদিনেই তার জীবনীশক্তি নিঃশেষ করে দেওয়া হয়। আর এ কাজটি করা হয় অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে। নির্দিষ্ট সময়ের মজুরি এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়, যা দিয়ে শ্রমিক তার সংসার চালাতে পারে না। তখন সে বাধ্য হয় ওভারটাইম কাজ করতে। বিনোদন মানুষের ছয়টি মৌলিক চাহিদার একটি। খাদ্য-বস্ত্রের মতো বিনোদন ছাড়াও মানুষ বাঁচতে পারে না। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) কর্তৃকও তা স্বীকৃত। সুতরাং একজন শ্রমিকের বিশ্রাম ও বিনোদনের সময় কমানোও আরেকটি শ্রম শোষণ।
সময়মতো মজুরি না দেওয়াও এক ধরনের শ্রম শোষণ। দেখা যাচ্ছে, এ কাজটি অহরহ হচ্ছে। অনেকটা ইচ্ছাকৃতভাবেই বিভিন্ন অজুহাতে এই কাজটি করা হয়। করা হয় এই কারণে যে, পরবর্তী সময়ে পুরো মজুরি মেরে দেওয়ার সুযোগ হয় এবং করাও হয় তাই। কাজ শেষ হয়ে গেলে প্রতারণা বা শক্তির আশ্রয় নিয়ে গোটা মজুরি মেরে দেওয়া হয়। এটা শ্রম শোষণের আরেকটি কলঙ্ককজনক দিক। এই কাজটি যারা করে তারা প্রাথমিক পর্যায়ে মজুরি নির্ধারণ করে তুলনামূলক একটু বেশি। আর বেশি পাওয়ার আশায় শ্রমিকরা বাকিতেও কাজ করে যায়। আদি থেকে আজ অবধি পৃথিবীতে যত শোষণ-নির্যাতন হয়েছে, তার সিংহভাগই শ্রম শোষণ। অথচ আল্লাহ তায়ালা শ্রমিকের প্রাপ্য না দেওয়াকে কঠিন ধমকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কেননা, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা বলেন, কেয়ামত দিবসে আমি তিন লোকের বিরুদ্ধে বাদী হবোÑ ১. যে লোক আমার নামে অঙ্গীকার করে পরে তা ভঙ্গ করেছে। ২. যে লোক স্বাধীন মানুষকে বিক্রি করে তার মূল্য খেয়েছে। ৩. যে লোক শ্রমিক নিয়োগ করে পূর্ণ কাজ আদায় করে নিয়েছে; কিন্তু তার প্রাপ্য মজুরি প্রদান করেনি।’ (বোখারি : ২২২৮)।
আসলে শ্রম শোষণের মূল কারণ হচ্ছে অতিরিক্ত ভোগস্পৃহা। অপরের সেবা গ্রহণের প্রবণতা এবং স্বল্প সময়ে ধনী হওয়ার আকাক্সক্ষা। ইসলাম ধর্ম এগুলোর পক্ষে নয়। ইসলামে সবধরনের শোষণ নিষিদ্ধ ও হারাম।

আপনার মতামত প্রদান করুন

টি মন্তব্য

Insurance Loans Mortgage

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by:

.