শনিবার, ২৬ মে, ২০১৮ খ্রীষ্টাব্দ | ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
জকিগঞ্জে বৃহত্তর খলাছড়া প্রবাসী কল্যান সংস্থার আহবায়ক কমিটির আত্মপ্রকাশ  » «   জকিগঞ্জ বিদ্যুতের অভিযোগ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ  » «   পাঠানচক প্রবাসী জনকল্যাণ সংস্থার কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা ও দরিদ্রদের মধ্যে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ অনুষ্ঠান শনিবার  » «   প্রতিবন্ধী ও দরিদ্রদের মধ্যে জকিগঞ্জ এইচটিএ সেবা ফাউন্ডেশনের চাল বিতরণ  » «   সিলেট তিব্বিয়া কলেজের প্রতিষ্ঠাতা প্রফেসর, জকিগঞ্জের সন্তান আব্দুর রবের ইন্তেকাল  » «   দূর্ঘটনায় নিহত জকিগঞ্জের সালমান আহমদ সুমনের দাফন  » «   দরিদ্র, প্রতিবন্ধীদের নিয়ে জকিগঞ্জ এইচটিএ সেবা ফাউন্ডশনের ইফতার  » «   বারহাল ছাত্র পরিষদের উদ্যোগে কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনা অনুষ্ঠান সম্পন্ন  » «   জকিগঞ্জে ফার্মাসিউটিকেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ এসো: কমিটি গঠন  » «   বাসের ধাক্কায় জকিগঞ্জের সুমনের মর্মান্তিক মৃত্যু  » «  

আত্মসাৎ : নিন্দিত ও গর্হিত

হাদিসে এসেছে, চারটি বিষয় এমনÑ এগুলো যার মাঝে পাওয়া যাবে সে পরিপূর্ণ মোনাফেক। আর যার মধ্যে এর কোনো একটি পাওয়া যাবে তার মধ্যে মোনাফেকের একটি বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেল, যতক্ষণ না সে তা বর্জন করে। তার কাছে কোনো কিছু আমানত রাখা হলে সে তা খেয়ানত করে, কথা বললে মিথ্যা বলে, অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে আর তর্ক করলে অশ্লীলতায় জড়িয়ে পড়ে।’ (বোখারি : ৩৪)

সহজ কথায় আত্মসাৎ বলতে আমরা বুঝি অন্যায়ভাবে কারও সম্পদ হাতিয়ে নেওয়া, অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে নিজের দখলে নিয়ে আসা। বিশ্বাস করে কেউ কারও হাতে নিজের সম্পদ তুলে দিল আর বিশ্বাসের এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে বিশ্বস্ত ব্যক্তি বিশ্বাসকারীর সম্পদ ছিনিয়ে নিল। অন্যের টাকায় তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সমৃদ্ধ হলো কিংবা ঘরে আসতে শুরু করল নামিদামি নানা জিনিসপত্র। এটাকে তাই কী বলা যায়Ñ চুরি, বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতারণা, বেঈমানি?
মানুষের এই সমাজে একে অন্যকে বিশ্বাস করেই চলতে হয়। সমাজবদ্ধ এই জীবনে বিশ্বাস ছাড়া চলা এক প্রকার অসম্ভব। এ বিশ্বাসেরই অপর নাম আমানতদারি। হাদিসের ভাষ্যÑ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যার আমানতদারি নেই তার তো ঈমানই নেই।’ (মুসনাদে আহমদ : ১২৩৮৩)। হাদিসের বক্তব্য তো স্পষ্টÑ এই বিশ্বাস যে ভঙ্গ করবে কার্যত একজন বেঈমান আর তার মাঝে কোনো ফারাক নেই।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাকের নির্দেশÑ ‘তোমাদের কেউ যখন কাউকে বিশ্বাস করে (তার কাছে আমানত রাখে), যার কাছে আমানত রাখা হলো সে যেন সেই আমানত পূর্ণরূপে আদায় করে দেয় এবং (এ বিষয়ে) সে যেন আল্লাহকে ভয় করে।’ (সূরা বাকারা : ২৮৩)।
আমানতের একটি সাধারণ অর্থ আমরা এমন বুঝিÑ যেমন কেউ নিজের টাকা বা অন্য কিছু অন্য কারও হেফাজতে রাখল। প্রচলিত অর্থে এটাই আমানত। কিন্তু ব্যাপক অর্থে ‘আমানত’ শব্দটি আরও অনেক কিছুকেই ধারণ করে। উচ্চপদস্থ কোনো কর্মকর্তা হিসেবেই হোক, আর দারোয়ান বা পিয়নের মতো নিচু স্তরের কোনো চাকরিই হোক, যারাই অন্যের কোনো কাজ করে দেয় মূলত সবাই চাকুরে। প্রত্যেক চাকুরের হাতেই চাকরিদাতার সম্পদ মূল্যবান আমানত। তাকে মনে রাখতে হবে, এ আমানতের যথাযথ সংরক্ষণের মধ্য দিয়েই সে তার জীবিকা উপার্জন করে থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। (রাষ্ট্রের) শাসক যিনি, তিনিও দায়িত্বশীল, তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। ব্যক্তি তার পরিবার-পরিজনের দায়িত্বশীল, তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। নারী তার স্বামীর ঘরের দায়িত্বশীল, তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে। খাদেম তার মনিবের সম্পদের দায়িত্বশীল, সে-ও তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (বোখারি : ৮৯৩)।
মনিবের সম্পদ তার খাদেম ও ভৃত্যের হাতে আমানত। মনিব তার হাতে নিজের সম্পদের ভার অর্পণ করে তা যথাযথ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে। হাদিসের ভাষ্য হলোÑ খাদেম ও ভৃত্যের এই যে দায়িত্ব, এটা শুধু দুনিয়ার এই সসীম জীবনের সঙ্গেই সম্পর্কিত নয়; বরং পরকালে মহান প্রভুর বিচারালয়েও এ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এ জিজ্ঞাসাবাদে যে সন্তুষ্ট করার মতো জবাব দিতে পারবে, সে পুরস্কৃত হবে।
যারা চাকুরে, তাদের হাতেও মালিকের সম্পদ আমানত। তাদেরকে তাদের মালিকের সম্পদ যথাযথ সংরক্ষণও করতে হবে, আবার আত্মসাৎ করে সে সম্পদ নিজের দখলে নেওয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে। সারাদিন মালিকের অজস্র টাকা নাড়াচাড়া করে তাদের তুষ্ট থাকতে হবে সামান্য বেতনে। বাহ্যত কাজটি কঠিন; কিন্তু আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস এ কঠিন কাজকেও সহজ করে দেয়। পরকালে বিশ্বাসী প্রতিটি মোমিন তো মনেপ্রাণে এ বিশ্বাসও করেÑ ‘যদি কেউ অণু পরিমাণ সৎকাজ করে, সে তা দেখবে। আবার যদি কেউ অণু পরিমাণ দুষ্কর্ম করে তাহলে সে তা-ও দেখবে।’ (যিলযাল : ৭-৮)।
দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হলো, বিশ্বাসের এ মানদ-ে আমরা দিন দিন তলিয়ে যাচ্ছি। মালিকের প্রতি অসন্তোষের সূত্র ধরে মিল-ফ্যাক্টরিতে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের আগুন লাগিয়ে দেওয়ার ঘটনা যেমন ঘটছে, তেমনি রিপুর টানে ভুল হিসাব দেখিয়ে কিংবা ভুয়া তথ্য দিয়ে মালিকের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করার ঘটনাও সমাজে কম নয়। এমনও দেখা যায়, সৎভাবে দিন কাটানো একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যেখানে অন্যের বাড়িতে ভাড়া থাকেন, সেখানে হয়তো তারই অধীন লোকরা শহরে বাড়ি-গাড়ির মালিক! কোথাও কোথাও এ দুর্নীতির ছায়া এতটাই গভীর, সেখানে সৎভাবে জীবন চালানোই এখন কষ্টকর হয়ে পড়েছে। ইচ্ছা না থাকলেও জড়িয়ে পড়তে হচ্ছে দুর্নীতিতে। যাতায়াত বা নাশতায় যদি ৮০ থেকে ১০০ টাকা খরচ হয়, সেখানে এটাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় নিয়ে যাওয়া কিংবা ২০ টাকায় কোনো পণ্য কিনে ২৫ টাকার বিল করিয়ে নেওয়া এখন কোনো বিরল বিষয় নয়। কথা হলো, একজন অফিসের দশজন কর্মচারী-কর্মকর্তার মাঝে যদি আটজনই এভাবে মালিকের সম্পদ ছিনিয়ে নেয়, তাহলে বাকি এক-দুজনের পক্ষে কি এ থেকে বেঁচে থাকাটা সহজ? একদিকে প্রবৃত্তির চাহিদা, এর সঙ্গে অন্যদের পক্ষ থেকে অসহযোগিতা ও অন্যায় অভিযোগের ভিত্তিতে চাকরি হারানোর আশঙ্কা। সবমিলিয়ে কাজটা মোটেও সহজ নয়। তবু কথা আছে। সৎভাবে জীবনযাপনে কেউ যদি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়, দুনিয়ার সংকট-শঙ্কা যদি পরকালের ভয়াবহ শাস্তির আশঙ্কাকে হারিয়ে না দেয়, তাহলে একটা পথ সে বের করে নেবেই। কখনও কিছুটা কষ্টকর মনে হলেও পদে পদে সে পাবে আল্লাহপাকের সাহায্য। হাদিসের ভাষ্য এমনই ঈমানজাগানিয়াÑ ‘আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমার বান্দা আমাকে নিয়ে যেরূপ ধারণা করে সে আমাকে তেমনই পাবে। সে যখনই আমাকে স্মরণ করে আমি তার সঙ্গেই আছি। যদি সে আমাকে মনে মনে স্মরণ করে আমিও তাকে মনে মনে স্মরণ করি। আর যদি সে আমাকে কোনো মজলিশে স্মরণ করে তাহলে আমি তাকে তার মজলিশের চেয়ে উত্তম এক মজলিশে স্মরণ করি। যদি সে আমার দিকে এক বিঘত অগ্রসর হয় তাহলে আমি তার দিকে এক হাত এগিয়ে যাই। যদি সে আমার দিকে এক হাত এগিয়ে আসে তাহলে আমি তার দিকে পূর্ণ দুই বাহু পরিমাণ অগ্রসর হই। কেউ যদি আমার দিকে হেঁটে হেঁটে আসে আমি তার দিকে দৌড়ে আসি।’ (মুসলিম : ২৬৭৫)।
ইমাম নববি (রহ.) এ হাদিসে মর্ম এভাবে বর্ণনা করেছেনÑ কেউ যদি আল্লাহর আনুগত্য করতে অগ্রসর হয় তাহলে তিনিও তার দিকে দয়া অনুগ্রহ সাহায্য ও তৌফিক নিয়ে অগ্রসর হন। বান্দার আনুগত্য যত বৃদ্ধি পায় আল্লাহ তায়ালার রহমত ও সাহায্যও ততই বাড়তে থাকে।
এর বিপরীতে যারা দুষ্ট চিন্তার শিকার হয়ে অন্যায়ভাবে মালিকের সম্পদ ছিনিয়ে নিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ছেন তাদের মনে রাখতে হবে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর বাণী। তিনি বলেছেন, ‘মোনাফেকের আলামত তিনটিÑ কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে, আর তার কাছে কোনো কিছু আমানত রাখা হলে সে তা খেয়ানত করে।’ (বোখারি : ৩৩)।
আরেকটি হাদিসে এসেছেÑ চারটি বিষয় এমন, এগুলো যার মাঝে পাওয়া যাবে সে পরিপূর্ণ মোনাফেক। আর যার মধ্যে এর কোনো একটি পাওয়া যাবে তার মধ্যে মোনাফেকের একটি বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেল, যতক্ষণ না সে তা বর্জন করে। তার কাছে কোনো কিছু আমানত রাখা হলে সে তা খেয়ানত করে, কথা বললে মিথ্যা বলে, অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে আর তর্ক করলে অশ্লীলতায় জড়িয়ে পড়ে।’ (বোখারি : ৩৪)।

আপনার মতামত প্রদান করুন

টি মন্তব্য

Insurance Loans Mortgage

সর্বশেষ সংবাদ

Developed by:

.